চামড়া শিল্প কেবল একটি বাণিজ্যিক খাত নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য এবং অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। রফতানি আয়ের অফুরন্ত সম্ভাবনার কারণে এই চামড়া আমাদের কাছে অন্যতম প্রধান জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। এমন মূল্যবান সম্পদ অবহেলায় নষ্ট হতে দেওয়া মানে জাতীয় অর্থনীতিতে কুঠারাঘাত করা।
কুরবানির পশুর চামড়াকে আমরা যদি সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পৌঁছে দিতে পারি, তবে এটি হবে স্মার্ট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক- সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চামড়া শিল্প একটি অমিত সম্ভাবনার নাম। তৈরি পোশাক খাতের পর এটিই একমাত্র বৃহৎ খাত, যার কাঁচামাল শতভাগ দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত। প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়, তার সিংহভাগই আসে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানিকেন্দ্রিক সরবরাহ চেইন থেকে।
তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণের অভাব এবং অশুভ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। এই বহুমূল্য সম্পদ রক্ষা করা কেবল নিছক কোনো ব্যবসায়িক লক্ষ্য নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যতম মৌলিক রক্ষাকবচ হিসেবে একে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম মানসম্মত চামড়া উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রাক্কলিত তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের চামড়ার গুণগত মান বিশ্বের সেরা দেশগুলোর তুলনায় কোনো অংশে কম নয়।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের পর চামড়া শিল্পই হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান ও দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি আয়ের উৎস। সরকার এই খাতের অমিত সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে একে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে। বর্তমানে এই খাত থেকে বছরে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হচ্ছে, যা সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে গড়ে দুই থেকে আড়াই কোটি পিস পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়। বছরের সাধারণ দিনগুলোতে মূলত অভ্যন্তরীণ মাংসের চাহিদা মেটাতে পশু জবাই হলেও চামড়া শিল্পের আসল প্রাণভোমরা হলো পবিত্র ঈদুল আজহা।
পরিসংখ্যান বলছে, এই শিল্পের মোট কাঁচামালের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসে কেবল কুরবানির তিন দিনে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এ বছর দেশে কুরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৫ লাখ এবং ছাগল-ভেড়া ৬২ লাখ। অর্থাৎ সারা বছরের মোট জোগানের অর্ধেকেরও বেশি সংগৃহীত হয় এই স্বল্প সময়ে।
এই বিশাল পরিমাণ কাঁচামাল মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ করা আমাদের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই সরবরাহ চেইনকে যদি বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতিতে সারা বছর সুশৃঙ্খল রাখা যেত, তবে চামড়া শিল্প থেকে জাতীয় আয় বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করা সম্ভব হতো।
প্রতি বছর কুরবানির পর দেখা যায়, লবণের দাম বৃদ্ধি বা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অজুহাতে হাজার হাজার চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় অথবা মাটিতে পুঁতে কিংবা নদীতে ফেলা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর সংগৃহীত চামড়ার প্রায় ২০-২৫ শতাংশ গুণগত মান হারায়।
একটি পশুর চামড়া ছাড়ানোর পর ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে যদি লবণ দিয়ে সংরক্ষণ না করা হয়, তবে তাতে পচন ধরতে শুরু করে। গ্রামীণ পর্যায়ে দক্ষ জনবল এবং পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহের অভাবে এই জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে, যা সরাসরি আমাদের জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চামড়া শিল্পের বড় বাধা হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট। কুরবানিদাতারা এবং মাঠ পর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার সঠিক দাম না পাওয়ায় এই খাতের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিশেষ করে এতিমখানা ও মাদরাসাগুলো, যারা চামড়া বিক্রির অর্থের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
এটি এক ধরনের মানবিক অর্থনীতির বিপর্যয়। চামড়া সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এবং ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পাওনা সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত না করলে এই খাতের সংকট কাটানো অসম্ভব।
হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশবান্ধব উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ। তবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশন না পাওয়ায় আমরা ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে সরাসরি চামড়া রফতানি করতে পারছি না।
ফলে আমাদের চামড়া কম মূল্যে নির্দিষ্ট কিছু দেশে রফতানি করতে হচ্ছে। অর্থনীতির রক্ষাকবচ হিসেবে এই শিল্পকে দাঁড় করাতে হলে সাভার ট্যানারি এস্টেটকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগই বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য একক খাতের ওপর এই অতিনির্ভরশীলতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চামড়া শিল্প হতে পারে আমাদের রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের প্রধান হাতিয়ার। বিশ্ববাজারে চামড়াজাত পণ্যের বিশাল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা মূলত কাঁচা চামড়া রফতানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছি।
অথচ এই চামড়া ব্যবহার করে জুতা, ব্যাগ, বেল্ট বা জ্যাকেটের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করে রফতানি করতে পারলে বর্তমান আয়ের চেয়ে দশগুণ বেশি আয় করা সম্ভব। জাতীয় অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় পোশাক খাতের বিকল্প হিসেবে চামড়া শিল্পকে দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।
চামড়া শিল্প কেবল একটি ম্যানুফ্যাকচারিং খাত নয়, এর সঙ্গে বিশাল একটি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা পশ্চাৎপদ সংযোগ জড়িয়ে আছে।
পশুপালনকারী প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে কসাই, মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী, আড়তদার এবং লবণ শিল্পের হাজার হাজার মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই শিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে কুরবানিকেন্দ্রিক যে বিশাল কর্মযজ্ঞ তৈরি হয়, তা সঠিক তদারকির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে কয়েক লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি অর্জনে এই শ্রমঘন শিল্পের উন্নয়ন অপরিহার্য।
চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান নিশ্চিত করতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত কুরবানির আগেই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত লবণের ‘বাফার স্টক’ গড়ে তুলতে হবে এবং বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে লবণের কৃত্রিম সংকট ও দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত অসতর্কভাবে চামড়া ছাড়ানোর কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চামড়া গুণগত মান হারায়।
তাই কসাই ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানো এবং দ্রুত লবণ দিয়ে সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তৃতীয়ত ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং পর্যাপ্ত নগদ অর্থের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা সময়মতো চামড়া সংগ্রহ করতে পারেন।
চতুর্থত সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে সরাসরি চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে প্রান্তিক বিক্রেতারা ন্যায্যমূল্য পান। পঞ্চমত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সাভার ট্যানারি এস্টেটের সিইটিপির পূর্ণ কার্যকারিতা নিশ্চিত করে দ্রুত এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের উদ্যোগ নিতে হবে।
একটি দেশের অর্থনীতি তখন শক্তিশালী হয় যখন তার নিজস্ব কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়। চামড়া আমাদের শতভাগ দেশীয় কাঁচামাল। আমরা যদি সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারি, তবে আমদানিকৃত রাসায়নিক ও প্রযুক্তির খরচ বাদেও নিট আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি হবে। তদুপরি এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ এবং চামড়া শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের জীবিকা রক্ষায় এই খাতের স্থায়িত্ব প্রয়োজন।
সর্বোপরি চামড়া শিল্প কেবল একটি বাণিজ্যিক খাত নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য এবং অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। রফতানি আয়ের অফুরন্ত সম্ভাবনার কারণে এই চামড়া আমাদের কাছে অন্যতম প্রধান জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। এমন মূল্যবান সম্পদ অবহেলায় নষ্ট হতে দেওয়া মানে জাতীয় অর্থনীতিতে কুঠারাঘাত করা।
কুরবানির পশুর চামড়াকে আমরা যদি সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পৌঁছে দিতে পারি, তবে এটি হবে স্মার্ট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক- সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ আমরা যে চামড়াটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করছি, তা কাল বৈদেশিক মুদ্রা হয়ে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করবে।
লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
/এসএকে