সুন্দরবনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারির ঠিক আগ মুহূর্তে মাছ ও কাঁকড়া ধরে লোকালয়ে ফেরার পথে মুক্তিপণের দাবিতে আবারও ছয়জন জেলেকে অপহরণ করেছে সশস্ত্র বনদস্যুরা।
রোববার (৩১ মে) রাত ১১টার দিকে সুন্দরবনের মালঞ্চ নদীর চালতেবেড়ে খাল ও সুবদে খাল এলাকা থেকে মাথাপিছু ৩০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণের দাবিতে তাদের অপহরণ করা হয়।
অপহরণকারীরা নিজেদের সুন্দরবনের কুখ্যাত ‘নানা ভাই ডন বাহিনী’র সদস্য পরিচয় দিয়ে সোমবার ১ জুনের মধ্যে টাকা না পাঠালে অপহৃতদের হত্যার হুমকি দিয়েছে।
জেলেদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় ১ জুন থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের ওপর তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। এই নির্দেশনা মেনে লোকালয়ে ফিরে আসার শর্তে গত শনিবার ৩০ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের কদমতলা স্টেশন থেকে কাঁকড়া ধরার অনুমতিপত্র বা পাস নিয়ে পাঁচটি নৌকায় মোট ১৮ জন জেলে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিলেন।
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাড়ি ফেরার পথে রোববার রাতে তারা সুন্দরবনের চালতেবেড়িয়া ও সুবদে খাল এলাকায় পৌঁছালে সশস্ত্র ডাকাত দল তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং পাঁচটি নৌকা থেকে ছয়জন জেলেকে জিম্মি করে গভীর বনে নিয়ে যায়।
অপহৃত জেলেরা হলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দক্ষিণ কদমতলীর কুলতলী এলাকার দেলোয়ার খাঁর ছেলে ইয়াছিন খাঁ ও আলমগীর খাঁ, হরিনগর গ্রামের আব্দুর রহিম মোল্যার ছেলে আল আমিন মোল্যা, খুলমা গাজীর ছেলে শহীদুল গাজী, আব্দুল গফুর গাজীর ছেলে শাহজাহান গাজী এবং নুরুল হক গাজীর ছেলে কামরুল গাজী।
অপহরণের সময় ইসমাইল খাঁ নামের এক জেলেকে নৌকার বৈঠা দিয়ে মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করে দস্যুরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় সোমবার দুপুরে তাকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। ডাকাতেরা বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে দ্রুত মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করার জন্য অপহৃতদের স্বজনদের ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে সুন্দরবনের কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা মনিরুল করিম জানান, জেলে অপহরণের বিষয়ে বনবিভাগের কাছে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই এবং অপহৃতদের পরিবারের কেউ তাদেরকে বিষয়টি অবহিত করেনি, তবে সামগ্রিক বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে খোঁজখবর নিয়ে দেখছেন।
অন্যদিকে শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ ‘ওসি’ মো. খালেদুর রহমান জানান, এ ব্যাপারে অপহৃতদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। স্বজনদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পেলে অপহৃতদের উদ্ধারে এবং দস্যুদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি ও পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আজ সোমবার ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের সাধারণ প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের নদী-খালগুলো বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ডিম ছাড়ার নিরাপদ ক্ষেত্র এবং বন্যপ্রাণীদের প্রজননকাল হওয়ায় এই সময়ে পর্যটকসহ সকল বনজীবীর প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। তবে এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার ফলে সুন্দরবনজীবী হাজারো পরিবারের দৈনিক আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় আগামী তিন মাস কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার দরিদ্র বনজীবী।
সময়ের আলো/টিএইচ