কুরবানির পশুর চামড়া গরিবের হক

মিজানুর রহমান

ইসলাম

কুরবানি আল্লাহর হুকুম। কুরবানির পশুর সবই কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে হয়। পশুর কোনো কিছু বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

2026-06-01T20:55:29+00:00
2026-06-01T20:55:29+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
কুরবানির পশুর চামড়া গরিবের হক
মিজানুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৮:৫৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
কুরবানি আল্লাহর হুকুম। কুরবানির পশুর সবই কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে হয়। পশুর কোনো কিছু বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কুরবানির পশুর চামড়াও বিক্রি করা যাবে না। বিক্রি করলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ গরিবকে দান করে দিতে হবে। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় যারা পশু কুরবানি করেন তারা কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রির টাকা সাধারণত স্থানীয় মাদরাসার গরিব ছাত্র, এলাকার এতিম-মিসকিন কিংবা গরিব মানুষের মধ্যে বিতরণ করে থাকেন। 

তবে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে চামড়ার দাম পাচ্ছেন না কুরবানিদাতারা। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কুরবানির পশুর চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরে কুরবানির পশুর চামড়ার দাম এতটাই কমেছে যে, বিক্রির জন্য ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায় না। 

লক্ষাধিক টাকার কুরবানির গরুর চামড়া বিক্রি হয় মাত্র হাজার টাকায়। অনেক জায়গায় আরও কম দামে বিক্রি হয়। যেসব অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো নিঃসন্দেহে তারা এতিম ও গরিবের হক নষ্ট করেছে।

গরিব ও এতিমের অধিকার : গরিব-মিসকিন ও এতিমের হক ও অধিকার আদায় করা ইসলামের নির্দেশ। এতিমের সঙ্গে কেমন ব্যবহার হবে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা আপনাকে এতিম সম্পর্কে জিগ্যেস করে। বলে দিন, তাদের সুব্যবস্থা তথা পুনর্বাসন করা উত্তম’ (সুরা বাকারা : ২২০)। 

এতিমদের হক নষ্ট করলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং জাহান্নামে যেতে হবে। আর যারা এতিমের হক আদায় করবে তাদের ঠিকানা হবে জান্নাত। এতিম প্রতিপালনের দ্বারা শুধু এতিমরাই উপকৃত হয় না, বরং এতিম প্রতিপালনকারীর রিজিক প্রশস্ত হয় এবং সে আল্লাহর রহমত ও বরকতপ্রাপ্ত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দুর্বল-অসহায়দের কারণেই তোমরা সাহায্য ও রিজিকপ্রাপ্ত হও।’ 

এতিম প্রতিপালনের মাধ্যমে মানুষের কঠোর হৃদয় নরম ও কোমল হয়। একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তার অন্তর কঠিন এ মর্মে অভিযোগ করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘যদি তুমি তোমার হৃদয় নরম করতে চাও তা হলে দরিদ্রকে খানা খাওয়াও এবং এতিমের মাথায় হাত বুলাও।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৭৫৭৬)

এতিম প্রতিপালনকারীর মর্যাদা : এতিমের প্রতি সদয় হওয়া অধিক সওয়াবের কাজ। কোনো এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে এতিমের মাথার চুলের সমপরিমাণ সওয়াব অর্জিত হয়। যারা এতিমদের কল্যাণে কাজ করবে তাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব (তিনি তর্জনী ও মধ্য অঙ্গুলি দিয়ে ইঙ্গিত করেন এবং এ দুটির মধ্যে তিনি সামান্য ফাঁক করেন)’ (বুখারি : ৫৩০৪)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো এতিমকে নিজের মাতা-পিতার সঙ্গে নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা করে এবং সে পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করে, তা হলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৮২৫২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘মুসলিমদের ওই বাড়িই সর্বোত্তম, যে বাড়িতে এতিম আছে এবং তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই বাড়ি, যে বাড়িতে এতিম আছে অথচ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়’ (ইবনে মাজাহ : ৩৬৭৯)। 

এতিমের সাহায্যকারী ও পুনর্বাসনকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘বিধবা, এতিম ও গরিবের সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে মুজাহিদের সমতুল্য। অথবা তার মর্যাদা সেই রাত জাগরণকারী নামাজির মতো, যে কখনো ক্লান্ত হয় না। অথবা তার মর্যাদা সেই রোজাদারের মতো, যে কখনো ইফতার করে না।’ (মুসলিম : ৫২৯৫)

গরিবের হক আত্মসাতের শাস্তি : অবৈধ পন্থায় মানুষকে জিম্মি করে অর্থ উপার্জন করার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অবৈধ পন্থায় গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দাংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না’ (সুরা বাকারা : ১৮৮)। 

আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে এতিম-মিসকিনদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। যারা এতিমের ধন-সম্পদ আত্মসাৎকারী তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমের ধন-সম্পদ ভোগ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে এবং অতিসত্বর তারা আগুনেই প্রবেশ করবে’ (সুরা নিসা : ১০)। এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎকারী কেয়ামতের দিন এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, আগুনের লেলিহান শিখা তাদের নাক-মুখ দিয়ে উদগীরণ হতে থাকবে। 

এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামতের দিন এক সম্প্রদায় নিজ নিজ কবর থেকে এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, তাদের মুখ থেকে আগুনের উদগীরণ হতে থাকবে।’ সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বললেন, ‘তোমরা কি লক্ষ করোনি যে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ভক্ষণ করে না’ (ইবনে হিব্বান : ৫৫৬৬)। 

যখন দেশে চামড়াজাত জুতা, ওয়ালেট, বেল্ট ইত্যাদি ছোট ছোট পণ্যের মূল্যও হাজার টাকার ওপরে তখন কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য শয়ের ঘরে নামিয়ে আনা মূলত গরিব-এতিমদের ওপর জুলুম। কুরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য দিতে যারা কারসাজি করছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যারা এই সম্পদ ভোগ করছে, আল্লাহর দরবারে তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

/কেএইচও


  বিষয়:   কুরবানি  পশুর চামড়া  গরিবের হক 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: