পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার সীমান্তঘেঁষা জনপদ, যেখানে দারিদ্র্য ও সামাজিক রক্ষণশীলতা মেয়েদের স্বপ্নপথে প্রতিনিয়ত বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেখান থেকেই উঠে এসেছেন ক্রীড়াবিদ সাকিবা জান্নাত সাম্মী, যিনি আজ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে লাল-সবুজ পতাকা গর্বের সঙ্গে বহন করছেন।
তিনি তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের তালুকবাড়ী গ্রামের সেকেন্দার আলীর বড় মেয়ে এবং তিন বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা এই তরুণীর শৈশব কেটেছে সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও পারিবারিক অভাবের মধ্য দিয়েই, যেখানে দায়িত্ব ও দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী।
২০১৮ সালে তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যয়নকালে তার ক্রীড়াজীবনের সূচনা হয়, যখন প্রথম কোচ আব্দুস সালামের হাত ধরে তিনি হ্যান্ডবল খেলার সঙ্গে যুক্ত হন এবং সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটে।
বর্তমানে সাকিবা জান্নাত সাম্মী বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য হিসেবে ঢাকা রাজারবাগ পুলিশ লাইনে কর্মরত রয়েছেন এবং দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিয়মিতভাবে ক্রীড়াচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে হ্যান্ডবল তার প্রধান খেলা হলেও ফুটবল, ভলিবল, কাবাডি, বাস্কেটবল এবং অ্যাথলেটিক্সেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে, এবং এ পর্যন্ত তিনি ১১ জন কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।
তার আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে যাত্রা আরও দৃঢ় হয় ২০২১ সালে তুরস্কের কোনিয়ায় অনুষ্ঠিত ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, যেখানে বাংলাদেশ দল তুরস্ক, আফগানিস্তান ও সেনেগালের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয় অর্জন করে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দেয়।
এরপর ২০২৩ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দশম এশিয়ান ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং উজবেকিস্তানে অনুষ্ঠিত IHF Women’s Championship Trophy Games-এ তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেন, যা তার নেতৃত্বগুণ ও ক্রীড়া দক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং বিদেশের মাটিতে তুরস্ক, ভারত ও উজবেকিস্তানে অংশ নিয়ে তিনি ‘সেরা খেলোয়াড়’ হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেন।
তার ক্রীড়া জীবনে রয়েছে পঞ্চগড় জেলা দলের হয়ে যুব গেমসে দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব, পাশাপাশি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ ও ফেডারেশন কাপে রানার্সআপ হওয়ার অভিজ্ঞতা, এবং জাতীয় পর্যায়ে পাঁচবার ‘সেরা খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হওয়ার গৌরব।
তবে এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না, কারণ একজন নারী ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাকে সামাজিক কটূক্তি, পারিবারিক অনটন, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মতো নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে, যা তাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেললেও তিনি কখনো লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।
তিনি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেন, মানুষ অনেক কথা বলবে, কিন্তু সেই কথায় কান না দিয়ে নিজের স্বপ্নের পেছনে লেগে থাকতে হবে, কারণ চেষ্টা অব্যাহত থাকলে একদিন লক্ষ্য পূরণ হবেই এবং সফলতার পর সমালোচকরাই সম্মান জানাবে।
তার বাবা সেকেন্দার আলী বলেন, দারিদ্র্যের মধ্যেও মেয়ের এই অর্জনে তিনি গর্বিত এবং পরিবারের সীমাবদ্ধতা জয় করে মেয়ের সাফল্যে তিনি আনন্দিত, পাশাপাশি তিনি সবার দোয়া কামনা করেন।
স্থানীয় আবুল হোসেন বলেন, সাম্মী তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন, যা এলাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয়।
তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা জয় করে তাদের শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করছে এবং এই অর্জন প্রতিষ্ঠানকে গৌরব ও সম্মান এনে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে সীমান্তঘেঁষা তালুকবাড়ী গ্রামের এই ক্রীড়াবিদ আজ শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং প্রান্তিক জনপদের মেয়েদের জন্য এক অনুপ্রেরণার প্রতীক, যার জীবনগাথা প্রমাণ করে যে সীমাবদ্ধতা যতই কঠিন হোক, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
আরবিএন