নওগাঁয় সমবায়ভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘উদয়ের পথে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে তিন শতাধিক গ্রাহকের প্রায় ৪ কোটি টাকা নিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমানতকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংস্থাটির পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারী ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুৎসহ সংশ্লিষ্টরা ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির মধ্যে কার্যক্রম গুটিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। প্রতিদিন গ্রাহকরা সংস্থার কার্যালয়ে গিয়ে তালাবদ্ধ অফিস দেখে ফিরে যাচ্ছেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ধামকুড়ি গ্রামে অবস্থিত ‘উদয়ের পথে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’-এর প্রধান কার্যালয়। সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সঞ্চয়, ডিপিএস ও আমানতের টাকা সংগ্রহ করে আসছিল। পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু, সহকারী ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুৎসহ প্রায় ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে আমানত সংগ্রহ করত। প্রতি এক লাখ টাকায় দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা মানুষকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করত। ফলে অনেকে মেয়ের বিয়ে, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা বাড়ি নির্মাণের উদ্দেশ্যে জীবনের সঞ্চিত অর্থ সেখানে জমা রাখেন। কিন্তু এখন সেই আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তারা।
ধামকুড়ি গ্রামের ফুটপাতে ফল বিক্রি করা প্রবীণ আব্দুর রহমান বলেন, তিনি অসুস্থ এবং তার স্ত্রীও প্রতিবন্ধী। একটি টিনের ঘরে বসবাস করেন তারা। কর্মজীবনের সব সঞ্চয়, প্রায় তিন লাখ টাকা, পাঁচ বছর আগে ওই প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছিলেন। আশা ছিল, লাভের টাকায় বাড়ি নির্মাণ করবেন। প্রথম দিকে কিছু লভ্যাংশ পেলেও পরে নানা অজুহাতে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এখন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা পালিয়ে যাওয়ায় তিনি স্ত্রীকে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
একই গ্রামের গার্মেন্টসকর্মী সীমা জানান, সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু তার শিক্ষক ছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দুই লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। ভবিষ্যতে মেয়ের বিয়ের খরচের কথা ভেবে অর্থ সঞ্চয় করলেও এখন প্রতারণার শিকার হয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তিনি তার কষ্টার্জিত অর্থ ফেরতের দাবি জানান।
গৃহবধূ মারুফা বিবি বলেন, সাত বছর আগে তিনি ৭০ হাজার টাকা ওই প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছিলেন। পরে ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর এক বছর আগে টাকা তুলতে গেলে প্রতিষ্ঠানটির লোকজন তাকে টাকা না দিয়ে উল্টো দুর্ব্যবহার করে। পরে তার স্বামীর হাতে মাত্র ২০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বাকি অর্থ আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম জানান, শুরুতে সংস্থার কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে করোনা মহামারির পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সংকুচিত হতে থাকে। গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হলেও কোনো ঋণ বিতরণ করা হতো না এবং লভ্যাংশও বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক করে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এক বছর কোনো লাভ দেওয়া সম্ভব হবে না, তবে পর্যায়ক্রমে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। গ্রাহকেরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়।
রোববার সরেজমিনে ধামকুড়ি গ্রামে গিয়ে সংস্থার কার্যালয় তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারী ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুতের বাড়িতেও গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নওগাঁ সদর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি এ উপজেলায় যোগদানের পর চলতি বছরে প্রতিষ্ঠানটির একটি অডিট বা পরিদর্শন পান। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি কোনো কাগজপত্র জমা দেয়নি। এ কারণে প্রায় ১৫ দিন আগে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন বাতিলের জন্য একটি নোটিশ জারি করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা পালিয়ে গেছেন কি না, সে বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। এছাড়া এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করেননি।
এদিকে প্রায় তিন শতাধিক গ্রাহকের চার কোটি টাকার বেশি আমানত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে যাওয়ার অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং তাদের ঘামঝরা কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
আরবিএন