তপ্ত বাতাসে দগ্ধ জনপদ

কায়সার রহমান রোমেল

সারাদেশ

সকাল গড়াতেই সূর্যের তেজ বাড়তে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই তেজ পরিণত হয় অসহনীয় তাপপ্রবাহে। বাতাসে নেই কোনো

2026-06-03T02:47:59+00:00
2026-06-03T02:47:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
তপ্ত বাতাসে দগ্ধ জনপদ
কায়সার রহমান রোমেল
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ২:৪৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
সকাল গড়াতেই সূর্যের তেজ বাড়তে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই তেজ পরিণত হয় অসহনীয় তাপপ্রবাহে। বাতাসে নেই কোনো শীতলতা, বরং প্রতিটি ঝাপটা যেন আগুনের হলকা হয়ে এসে আঘাত করছে শরীরে। 

উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় কয়েক দিন ধরে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। মানুষ, প্রাণী, ফসল ও প্রকৃতি- সবকিছুই যেন তাপপ্রবাহের নির্মম দহনে ক্লান্ত।

মঙ্গলবার বেলা ১১টার পর থেকে জেলার তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে অবস্থান করে। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। তবে আবহাওয়ার এই পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরতে পারছে না। কারণ আর্দ্রতার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি মনে হচ্ছে। বাইরে বের হলেই মনে হচ্ছে আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। ঘরের ভেতরে ফ্যান ঘুরলেও মিলছে না স্বস্তি। অনেকেই বলছেন, ফ্যানের বাতাসও যেন গরম ‘লু হাওয়া’ হয়ে উঠেছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বাজার, সড়ক ও জনসমাগমস্থলগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি কম। তবে জীবিকার তাগিদে যাদের বাইরে থাকতে হচ্ছে, তাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। 

রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নির্মাণ শ্রমিক, ক্ষেতমজুর ও দিনমজুরদের কাজ করতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। প্রচণ্ড রোদে কিছুক্ষণ কাজ করলেই শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। বারবার পানি পান করেও তৃষ্ণা মিটছে না। শহরের বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, শ্রমজীবী মানুষ গাছের ছায়া কিংবা দোকানের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করছেন। অনেকেই বলছেন, দুপুরের দিকে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।

তাপপ্রবাহের কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকের কাছেই এখন খাবারের চেয়ে পানি বেশি প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে। ঠান্ডা পানি, শরবত ও ডাবের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। শহরের ফুটপাথ ও বাজার এলাকার শরবতের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সামান্য স্বস্তির আশায় এসব দোকানে ভিড় করছেন।

তীব্র গরমের প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপরও। চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমে শরীরে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, জ্বর, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গাইবান্ধার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থান করলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যায়। ফলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, এমনকি হিটস্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এ কারণে তারা পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান, খাবার স্যালাইন গ্রহণ এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়ছে কৃষি ও পরিবেশেও। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদী-নালা, খাল-বিল ও ছোট জলাধারগুলোর পানির পরিমাণ কমে আসছে। কোথাও কোথাও জলাশয় শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। কৃষকরা বলছেন, প্রচণ্ড রোদে জমির আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এতে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। অনেক এলাকায় সেচের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাটির নিচের পানির স্তরও কমতে শুরু করেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এর ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির স্তর নিচে নেমে গেলে দূষণের ঝুঁকি বাড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

তাপপ্রবাহের এই দহন থেকে রেহাই পাচ্ছে না প্রাণিকুলও। গবাদি পশুগুলোকে সারাক্ষণ হাঁপাতে দেখা যাচ্ছে। পশু-পালকরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখন গরু-ছাগল অনেক বেশি পানি পান করছে। অন্যদিকে গাছে গাছে উড়ে বেড়ানো পাখিগুলোও পানির সন্ধানে ছোটাছুটি করছে। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ যেন এক পশলা বৃষ্টি আর একটু শীতল বাতাসের জন্য অপেক্ষা করছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ ও চিকিৎসকরা বলছেন, তাপপ্রবাহ চলাকালে দিনের বেলা খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে বের হলে ছাতা ব্যবহার, হালকা রঙের পোশাক পরা, পর্যাপ্ত পানি ও স্যালাইন সঙ্গে রাখা এবং বিশুদ্ধ পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতির এই কঠিন পরীক্ষার মধ্যে গাইবান্ধার মানুষ এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এক পশলা বৃষ্টি, একটু মেঘ আর কিছুটা শীতল বাতাসের প্রত্যাশায় দিন গুনছেন সবাই। কারণ এই মুহূর্তে জেলার মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া- তাপপ্রবাহ থেকে সামান্য স্বস্তি।

/এসএকে


  বিষয়:   তপ্ত  বাতাস  দগ্ধ  জনপদ  গরম  তাপ  বাংলাদেশ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: