আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন অনেকেই দেখে, কিন্তু সেই স্বপ্নকে ডানা দিয়ে নীল আকাশে উড়িয়ে দেখালো ১৫ বছরের এক কিশোর। শুধুমাত্র ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ‘ইউটিউব’ দেখে আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে নিজের হাতে তৈরি করেছে রিমোট নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র বিমান।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার আকাশে ফাহিম শাহরিয়ারের এই উদ্ভাবন এখন পুরো জেলাজুড়ে বিস্ময় আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে তেঁতুলিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফাহিমের তৈরি বিমানের সফল উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেন বহু উৎসুক মানুষ। রিমোটের ইশারায় যখন বিমানটি মাটি ছেড়ে আকাশে ডানা মেলল, তখন উপস্থিত জনতা করতালির মাধ্যমে খুদে এই বিজ্ঞানীকে অভিনন্দন জানান। এলাকা জুড়ে আকাশে স্বচ্ছন্দে বিচরণ ও সফল অবতরণের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন সবাই।
ফাহিম শাহরিয়ার নীলফামারীর সৈয়দপুর বিজ্ঞান কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের কালান্দিগঞ্জ কুমারটোল গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ নীলফামারীর সৈয়দপুর বিজ্ঞান কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
ফাহিমের এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। সে জানায়, ১২ বছর বয়স থেকেই বিমানে ওড়ার ও ওড়ানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই স্বপ্ন পূরণে তার ‘প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে কাজ করেছে ইউটিউব। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ও বাবা মায়ের উৎসাহের অর্থে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে সে অন্তত দুইবার বিমান তৈরিতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু হাল ছাড়েনি। দীর্ঘ দুই বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় তৃতীয়বারের চেষ্টায় বিমান সফলভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়।
তরুণ উদ্ভাবক ফাহিমের তৈরি এই বিমানটির ওজন মাত্র ৫০০ গ্রাম। যা মিডিয়াম সাইজের ট্রেইনার বিমান। এর উইংস্প্যান (Wingspan) ৪০ ইঞ্চি এবং ফিউজলেজ দৈর্ঘ্য (Fuselage Length) ২৮.৫ ইঞ্চি। আকাশপথে প্রায় ১ কিলোমিটার পর্যন্ত উড্ডয়ন সক্ষম এই বিমানে ব্যবহার করা হয়েছে শক্তিশালী ব্রাশলেস ডিসি মোটর। আর গতি ও সুনির্দিষ্ট দিক পরিবর্তনের জন্য এতে রয়েছে বিশেষ সার্ভো মোটর। বিমানটির আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়েছে ফ্লাইস্কাই এফএস-আই৬এক্স (Flysky FS i6X) রিমোট কন্ট্রোল এবং রেডিওলিঙ্ক বাইম-এ (RadioLink Byme A) ফ্লাইট কন্ট্রোলার।
সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ফাহিম শাহরিয়ার বলে, ‘বিমানটি যখন প্রথম আকাশে ওড়ে, তখন মনে হয়েছিল আমার সব পরিশ্রম সার্থক। প্রথমে অনেকে পাগল বলত, কিন্তু আজ সবাই প্রশংসা করছে। আমি ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে আরও উন্নত ড্রোন ও ড্রোন-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাই এবং দেশের জন্য কিছু করতে চাই।’
ফাহিমের বাবা বাকী বিল্লাহ ছেলের সাফল্যে গর্বিত। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ওর মধ্যে সৃষ্টিশীলতার প্রবল আগ্রহ ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই সে কার্টন দিয়ে নানা মডেল তৈরি করত। শুরুতে বিমান তৈরির কথা শুনে সংশয় থাকলেও ওর আত্মবিশ্বাস দেখে আমি উপকরণ কিনে দিই। বারবার ব্যর্থ হয়েও সে হাল ছাড়েনি, এটাই বড় পাওয়া।’
আইসিটি শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ফাহিম শাহরিয়ার অল্প বয়সে যে উদ্ভাবনী কাজটি করেছে, তা প্রশংসার দাবিদার। বর্তমান যুগে কিশোররা যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট করছে, তখন ফাহিম আবিষ্কারের নেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে। তার এই অর্জন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা।’
স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, ফাহিমের মতো কিশোরদের যদি সরকারি বা বেসরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হয়, তবে তারা ভবিষ্যতে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বড় অবদান রাখতে পারবে। ফাহিমের এই অর্জন প্রমাণ করে— মেধা ও অধ্যবসায় থাকলে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আকাশ ছোঁয়া সম্ভব।
সময়ের আলো/জেডি