চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বনের জায়গা দখল ও টংঘর তৈরি করে বন্যহাতি চলাচল পথে (করিডোর) প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রাজঘাটা টংকাবতী বনবিট অফিসের সামনে ভরারচর ও সেগুনবাগান এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে জানা যায়, টংকাবতী বনবিট অফিসের আশপাশে টংকাবতী নদীর দুইপাশের বনের প্রায় ১ একর জায়গা দখল করে রেখেছেন স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী চক্র। বনাঞ্চল পরিষ্কার করে এসব জায়গায় করা হচ্ছে চাষাবাদ। বনের জীববৈচিত্র ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। ফসল রক্ষার নামে হাতি তাড়ানোর উদ্দেশ্যে বনবিট অফিসের ৫০০ মিটার পূর্বে বনের জায়গা দখল করে ৭টি টংঘর তৈরি করা হয়েছে। বনের গাছ কেটে এসব টংঘর তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে। টংকাবতী বনবিট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব টংঘর তৈরি করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। এসব টংঘরে স্থানীয়রা রাত্রিযাপন করে থাকেন।
তারা রাতে লাইট জ্বালিয়ে হাতি তাড়িয়ে থাকেন। অথচ এটি বন্যহাতিরা তাদের চলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহার থাকে। ফলে মানুষের উপস্থিতি বন্যহাতি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে আসছে। এতে অনেক সময় লোকালয়ে হানা দেয় বন্যহাতির দল।
স্থানীয় নূর, আবদুল মালেক টংকাবতী ভরারচর এলাকায় ১টি, কাদের, মঞ্জুর, তৈয়ব আলী, আবদুল মজিদ, সেলিম সেগুনবাগান এলাকায় ৬টি সহ মোট ৭টি টংঘর তৈরি করেছেন। এসব টংঘর তৈরির ফলে বন্যহাতি চলাচল পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে।
এসব টংঘরে আলো জ্বালিয়ে হাতি চলাচল পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বন্যহাতি তার চলাচল পথে প্রতিবন্ধকতা পেয়ে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি এন্ড ইনভাইরনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের হাতি গবেষক অধ্যাপক ড. এ এইচ এম রায়হান সরকার বলেন, ‘২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বেসরকারি সংস্থা আই-ইউ-সি-এন পরিচালিত জরিপে হাতির চলাচলের ১২টি করিডর চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ বন বিভাগের আওতায় থাকা চুনতি-সাতগড় করিডরটি এখন প্রায় বন্ধ। এভাবে বনের জায়গা দখল ও টংঘর তৈরি করে বন্যহাতি চলাচলে করিডোরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে; যা কিছুতেই কাম্য নয়। ফলে মানুষ ও হাতির মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়; যা উভয় পক্ষের জন্যই প্রাণঘাতী হতে পারে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কৃষক বলেন, ‘টংকাবতী বনবিট অফিসের ৫০০ মিটারের মধ্যে টংকাবতী নদীর দুইপাশে পহরচান্দা মৌজায় ভরারচর ও চরম্বা সেগুনবাগান এলাকায় বনের জায়গায় মোট ৭টি টংঘর করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত স্থানীয়রা এসব টংঘরে পাহারা বসিয়ে হাতি চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন সময় হাতি লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। অনেক সময় বন্যহাতি কৃষকের ফসল নষ্ট করছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যহাতি সাধারণত তার নির্দিষ্ট পথ ধরে (করিডোর) চলাচল করে। তার চলাচল পথে টংঘর বা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে হাতির আবাসস্থলের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তার স্বাভাবিক চলাচল পথ বন্ধ হয়ে যায়। চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা বাধা পেলে বন্যহাতি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। ফলে হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করে। মানুষ ও হাতির মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়; যা উভয় পক্ষের জন্যই প্রাণঘাতী হতে পারে।
টংকাবতী বনবিট কর্মকর্তা ইমন বিল্লাহ এসব জায়গায় বনের নয় বলে দায় এড়াতে চেষ্টা করেন। তিনি এসব টংঘর ভেঙে দিবেন বলেও আশ্বস্ত করেন। বন্যহাতি চলাচল পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তিনি জানান।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ পদুয়া বন রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াদুর রহমান ভূইয়া বলেন, ‘বন্যহাতি চলাচল পথে টংঘর তৈরি করে চলাচল পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
/কেএইচও