চলতি সপ্তাহে মিশরের রাজধানী কায়রোতে ফিলিস্তিনি উপদলগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই বৈঠকের ঠিক প্রাক্কালে হামাস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা এখনই তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে না। মার্কিন মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ‘অস্ত্রীকরণ’-এর তীব্র বিরোধিতা করে গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তাদের সামরিক অস্ত্রাগারের ভবিষ্যৎ কী হবে— তা অন্যান্য ফিলিস্তিনি উপদলগুলোর সাথে ব্যাপক আলোচনার পরই কেবল নির্ধারণ করা হবে।
কাতার ভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল জাজিরাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হুসাম বাদরান এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সাথে স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা প্রক্রিয়া সচল করতে দীর্ঘমেয়াদি ‘হুদনা’ বা যুদ্ধবিরতির একটি নতুন প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
হুসাম বাদরান আল জাজিরাকে বলেন, যখন ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ তথা ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটি গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তখন গাজার রাস্তা বা গলিতে দৃশ্যমান কোনো অস্ত্র থাকবে না। সেখানে কেবল অফিশিয়াল ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রই দেখা যাবে। গাজায় অতীতে আমরা যে ধরনের সশস্ত্র মহড়া বা অস্ত্রের উপস্থিতি দেখে অভ্যস্ত ছিলাম, তেমন কিছু আর থাকবে না।
তবে বাদরান এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই পদক্ষেপের অর্থ কোনোভাবেই প্রথাগত অস্ত্র সমর্পণ বা আত্মসমর্পণ নয়। তিনি বলেন, আমরা অস্ত্র হস্তান্তরের কথা বলছি না। আমরা বলছি, ফিলিস্তিনি পুলিশের অফিশিয়াল অস্ত্র ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র অন্তত প্রকাশ্যে দেখা যাবে না। আর এই বিষয়ের খুঁটিনাটি সমস্ত বিবরণ একটি জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক বা ফিলিস্তিনি উপদলগুলোর অভ্যন্তরীণ আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
জানা গেছে, কায়রোতে ফিলিস্তিনিদের এই বৈঠকে আটটি প্রধান ফিলিস্তিনি উপদল অংশ নিতে যাচ্ছে। যার লক্ষ্য একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান তৈরি করা। হুসাম বাদরান নিশ্চিত করেছেন, হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন, ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন, পিএফএলপি-জিসি, ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ, পপুলার রেজিস্ট্যান্স কমিটি এবং ফাতাহ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ডেমোক্রেটিক রিফর্ম কারেন্টের প্রতিনিধিরা এই সংলাপে যোগ দেবেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত মূল যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাটি বাঁচিয়ে রাখাই এই বৈঠকের লক্ষ্য। তবে হামাস নেতার অভিযোগ, প্রথম দফার শর্তাবলীর ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করেনি ইসরায়েল। বাদরান বলেন, আমরা মানবিক সহায়তা, রাফাহ ক্রসিংয়ের কার্যকারিতা, অবকাঠামো সংস্কার এবং হত্যাকাণ্ড বন্ধের কথা বলছি। চুক্তি অনুযায়ী একটি ব্যাপক যুদ্ধবিরতির কথা থাকলেও এ পর্যন্ত প্রায় ১,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। ইসরায়েল ৩০ শতাংশ শর্ত মেনেছে বলাটাও আসলে বাড়িয়ে বলা।
ফিলিস্তিনি উপদলগুলো যেখানে প্রথম দফার মানবিক শর্ত পূরণের দাবি জানাচ্ছে, সেখানে ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর গাজা বিষয়ক উচ্চপ্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ দ্বিতীয় দফায় যাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রহীনকরণের ওপর জোর দিচ্ছেন।
এই অচলাবস্থা কাটাতে ম্লাদেনভ সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি ১৫ দফার ‘রোডম্যাপ’ পেশ করেছেন। তিনি জানান, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনো ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের অস্ত্র ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করতে হবে না। বরং অস্ত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি হবে ধাপে ধাপে, যা ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে এবং সব অস্ত্র জমা দেওয়া হবে জাতীয় কমিটির কাছে। এর বিনিময়ে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার পেরিমিটার বা সীমান্ত এলাকায় ক্রমান্বয়ে পিছু হটবে এবং সেখানে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
ম্লাদেনভ সতর্ক করে বলেছেন, গাজার ৮৫ শতাংশ ভবন ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই রোডম্যাপ প্রত্যাখ্যান করলে গাজা পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল মিলবে না এবং গাজা স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে, যেখানে হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকবে অর্ধেকেরও কম অঞ্চল।
তবে ফিলিস্তিনিরা এই ১৫ দফার ফ্রেমওয়ার্ককে ইসরায়েলের একটি সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে দেখছে। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইসাম আফিফা আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েল আলোচনার সময়টিকে ব্যবহার করে গাজার জনগণকে ক্রমাগত হামলার মাধ্যমে ক্লান্ত করে তুলছে। তারা ট্রাম্পের ২০ দফার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এখন সম্পূর্ণ ‘অস্ত্রীকরণ’ কেন্দ্রিক ১৫ দফার ফাঁদ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কোনো গ্যারান্টি ছাড়াই বড় ছাড় দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
আফিফার মতে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ফায়দা এবং নির্বাচনী লাভের জন্য এই আলোচনাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি গাজার ৬০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ থেকে বাড়িয়ে তা ৭০ শতাংশ বা তার বেশিতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
হামাস ক্ষমতার লোভ করছে— এমন অভিযোগের জবাবে গোষ্ঠীটির মুখপাত্র হাজেম কাসেম জানান, তারা কায়রো-ভিত্তিক ‘জাতীয় কমিটি’র কাছে সমস্ত প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ফাইল হস্তান্তর করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় কমিটির এক সদস্য আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি চাপের কারণে এই কমিটি নিজেই এখন জিম্মি হয়ে পড়েছে। কমিটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা সামরিক জোনের ভেতরে গিয়ে কাজ করবে না এবং ইসরায়েল-সমর্থিত কোনো সশস্ত্র মিলিশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা করবে না। এছাড়া, বাফার জোনে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন না হওয়া পর্যন্ত কমিটি গাজায় প্রবেশ করবে না।
রাজনৈতিক এই অচলাবস্থার মাঝেই গাজায় ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নতুন করে ৯৩৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২,৮৬৮ জন আহত হয়েছেন। এর ফলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও গণহত্যায় মোট ফিলিস্তিনির মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২,৯৪২ জনে এবং আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৭২,৯৬৭।
/কহু