ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ বন্দির চাপ নিয়ে চরম প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে শতবর্ষী চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার। ১ হাজার ৮৫০ জন ধারণক্ষমতার এই কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ৬ হাজার ৯ জন। বন্দিদের এই উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে এবং অপরাধীদের পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এবার ভিন্নধর্মী এক পরিকল্পনা করছে কারা কর্তৃপক্ষ।
অপরাধের ধরন ও অঞ্চলভেদে পুরো কারাব্যবস্থাকে চারটি পৃথক ভাগে বিন্যস্ত করার একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে আইনজীবীরা মনে করছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই কারাগারে মহানগরের ১৬টি থানার মামলার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার এবং জেলার বিভিন্ন থানার আরও দেড় হাজার আসামি রয়েছেন। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার মাদক মামলার আসামি, ৬০০ জলদস্যু এবং সাড়ে ৩০০ রোহিঙ্গা এখানে বন্দি থাকছেন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত ওভারলোডেড একটি কারাগার। জায়গার সংকট থাকায় একে বড় করাও সম্ভব নয়। এই অবস্থায় কোনো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন থাকি।’
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমান মূল কারাগারে শুধু চট্টগ্রাম জেলার আসামিদের রাখা হবে এবং মহানগরের বন্দিদের জন্য সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি মাদক কারবারি এবং রোহিঙ্গা ও দুর্ধর্ষ অপরাধীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা জোনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন) মো. ছগির মিয়া বলেন, ‘মাদক মামলার বন্দিদের জন্য একটি আলাদা জোন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিশোর বন্দিদের জন্যও পৃথক ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন অপরাধীদের আলাদা রাখা গেলে তাদের মধ্যে অপরাধের নতুন ছক বা পরামর্শ করার সুযোগ কমবে, ফলে সামগ্রিকভাবে অপরাধ কমে আসবে।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হকও জানান, একই স্থানে সব ধরনের অপরাধী থাকলে ছোট অপরাধীরা বড় অপরাধীদের সংস্পর্শে এসে আরও বেশি অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
তবে কারা কর্তৃপক্ষের এই বিভাজন পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন স্থানীয় আইনজীবী নেতারা। বর্তমান চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালত ভবনের দূরত্ব ৫০০ গজেরও কম হওয়ায় আসামিদের আনা-নেওয়া সহজ হলেও, কারাগার দূরে সরিয়ে নিলে বিচারকাজ ব্যাহত হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘একজন আসামির বিরুদ্ধে অনেক সময় একাধিক প্রকৃতির মামলা থাকে। সেক্ষেত্রে তাকে কি একাধিক কারাগারে রাখা হবে? এতে হাজার হাজার মামলা ও নথি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং বিষয়টি নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করতে পারে।’
সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিক আহমেদ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘নতুন একাধিক কারাগার নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তার চেয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বর্তমান কারাগারের ভেতরেই কঠোর নজরদারির মাধ্যমে আলাদা আলাদা সেলে বন্দিদের ভাগ করে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’
কারাবিধি অনুযায়ী প্রতিটি বন্দির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও অতিরিক্ত বন্দির কারণে এই শতবর্ষী কারাগারে তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কারাগার বিভাজনের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকলেও, এই কারাগারের দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/জেডি