মিরপুরের সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চার দেয়ালের ফ্ল্যাটটির বাইরে থেকে দেখতে কতটা জমকালো ছিল, তা এখন আর কারও মনে পড়ে না। বাতাসে তখন ছড়াচ্ছিল এক তীব্র, দমবন্ধ করা গন্ধ, যা প্রতিবেশীদের বিচলিত করে তুলেছিল বেশ কয়েক দিন ধরে। অবশেষে যখন নার্স ও পুলিশ এলো, তখন ঘরের ভেতরের দৃশ্যটি সভ্য সমাজের মুখে এক তীব্র চপেটাঘাত হয়ে সামনে এলো। বিছানায় পড়ে ছিল ৭৫ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা মায়ের গলিত, পোকা ধরা নিথর দেহ, যা অবহেলা আর নির্মমতার এক চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, মায়ের এই চরম অবহেলার পেছনে কোনো চরম দারিদ্র্য বা অশিক্ষার গল্প ছিল না। মৃত মায়ের সন্তানরা সমাজের তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং বিত্তশালী শ্রেণির প্রতিনিধি, যারা নিজেদের ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ডিগ্রিধারী হয়ে বড় বড় পদে আসীন হওয়া মানেই ভালো মানুষ হওয়া নয়। নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা যে কতটা অন্ধকার তৈরি করতে পারে, এই ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত এবং নির্মম প্রমাণ।
মরদেহ উদ্ধারের সময় নার্সদের সামনে ভুক্তভোগীর মেয়ের অসত্য তথ্য যেমন- আজ সকালেও মা খেয়েছে এমন নাটক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর পর এমন নাটক আসলে নিজের অপরাধ ঢাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। এই কৃত্রিম শোকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম সত্যটি হলো, জীবিত মায়ের চেয়ে নিজের সামাজিক অবস্থান আর অহংকারকে বাঁচানোই ছিল সেই সন্তানের কাছে প্রধান লক্ষ্য।
আমাদের সমাজের এই সামগ্রিক নৈতিক অবক্ষয় এক দিনে তৈরি হয়নি, এটি দীর্ঘদিনের মূল্যবোধের ক্ষয়ের ফসল। আমরা সাফল্যের সংজ্ঞা বদলে ফেলেছি; এখন টাকা আর ক্ষমতাই যেখানে শেষ কথা, সেখানে বৃদ্ধ মা-বাবা অনেক সময় বোঝা হিসেবে গণ্য হন। মানবিকতার এই চরম বিপর্যয় আমাদের বাধ্য করছে ভাবতে যে, আমরা আসলে কোন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছি, যেখানে জন্মদাত্রীর প্রতি ন্যূনতম কর্তব্যবোধও বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
আধুনিক নগর জীবনে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এখন এক মরণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে, যেখানে একই ছাদের নিচে বা একই শহরে থেকেও মানুষ একে অন্যের থেকে বহুদূরে বাস করে। রক্তের সম্পর্কগুলো এখন আর হৃদয়ের টানে নয়, বরং এক ধরনের যান্ত্রিক বাধ্যবাধকতায় টিকে আছে। মিরপুরের এই ফ্ল্যাটটি আসলে কোনো বাড়ি ছিল না, এটি ছিল পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার এক কংক্রিটের খাঁচা, যেখানে সম্পর্কের উষ্ণতা অনেক আগেই মরে গিয়েছিল।
এই বিচ্ছিন্নতার হাত ধরেই সমাজে নিঃসঙ্গতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এক জ্যামিতিক হারে, বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধদের জীবনে। সন্তানদের ব্যস্ততা আর আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে প্রবীণরা জীবদ্দশাতেই এক ধরনের জীবন্ত লাশে পরিণত হন। একাকিত্বের এই নীরব যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা মিরপুরের সেই অন্ধকার ঘরে একা একা তিলে তিলে মারা যাওয়া বৃদ্ধা মায়ের চেয়ে ভালো আর কেউ হয়তো অনুধাবন করতে পারেনি।
আজকের এই বাস্তবতায় আমাদের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঠগড়ায়, যা কেবল জিপিএ-৫ আর ভালো চাকরির নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু একজন আদর্শ মানুষ গড়তে ব্যর্থ হচ্ছে। যে শিক্ষা সন্তানকে মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল করতে পারে না, সেই শিক্ষার সনদ আসলে এক টুকরো অর্থহীন কাগজ মাত্র। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই বিশাল গলদ দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতে এমন আরও অনেক মিরপুর ট্র্যাজেডির সাক্ষী হতে হবে আমাদের।
সমাজ থেকে মানবিক মূল্যবোধের এই চরম বিলুপ্তি আমাদের এক হিংস্র এবং অনুভূতিহীন জাতিতে পরিণত করছে। দয়া, মায়া, মমতা এবং শ্রদ্ধাবোধের মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলি এখন ডায়েরির পাতায় বা ফেসবুকের স্ট্যাটাসেই সীমাবদ্ধ। বাস্তব জীবনে আমরা এতটাই অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছি যে, মায়ের গলিত মরদেহের পাশে দাঁড়িয়েও অনেকে নিজেদের স্বার্থের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত থাকি।
একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এই ধরনের আচরণ কেবল অবহেলা নয়, বরং এক ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ততার লক্ষণ। নিজের জন্মদাত্রী মাকে অবহেলা করে, তার খোঁজ না নিয়ে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেওয়া কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না। এই মানসিক বিকৃতি প্রমাণ করে যে, আমাদের ভেতরের মানবিক কাঠামোগুলো কতটা ভেঙে পড়েছে এবং আমরা কতটা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে উঠছি।
এই নিঃসঙ্গ মৃত্যু আসলে কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক হত্যাকাণ্ড, যা প্রতিদিন নীরবে ঘটে চলেছে অসংখ্য প্রবীণ মানুষের জীবনে। শেষ বয়সে এসে একটু কথা বলার মানুষ না পাওয়া, এক গ্লাস জল দেওয়ার মতো কাউকে পাশে না পাওয়া যে কী করুণ তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। মিরপুরের সেই মা যখন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছিলেন, তখন তার চোখের কোণে নিশ্চয়ই ছিল সন্তানদের মুখ দেখার এক অন্তহীন আকুতি।
এই পুরো ঘটনায় প্রতিবেশীদের উদাসীনতা আমাদের নগর সংস্কৃতির এক কুৎসিত রূপকে উন্মোচন করে। আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট কালচারে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটি কে, বা সে কেমন আছেÑ তা জানার কোনো তাগিদ কেউ অনুভব করে না। তীব্র গন্ধ পাওয়ার পরও দিনের পর দিন চুপ থাকা এবং কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া প্রমাণ করে যে, আমরা কতটা আত্মকেন্দ্রিক আর অনুভূতিহীন প্রতিবেশী হয়ে উঠেছি।
আজকের সমাজে অবহেলিত বৃদ্ধাশ্রমগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেখানে প্রবীণদের উপচেপড়া ভিড় আমাদের পারিবারিক ব্যবস্থার দেউলিয়াত্বকে ফুটিয়ে তোলে। অনেকেই মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে নিজেরা মুক্ত জীবনের আনন্দ খোঁজেন, আবার অনেকে ঘরের কোণে ফেলে রেখে বৃদ্ধাশ্রমের চেয়েও করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। রাষ্ট্র এবং সমাজের উচিত এই প্রবীণ নিবাসগুলোর সঠিক তদারকি করা এবং বৃদ্ধ মা-বাবার অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া।
সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধনই ছিল আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির মূল শক্তি, যা আজ পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার এবং একক পরিবার থেকে এখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জীবনের দিকে ঝুঁকছে তরুণ প্রজন্ম। এই পারিবারিক ভাঙন ঠেকাতে না পারলে সমাজের মূল ভিত্তিটাই ধসে পড়বে, যেখানে কোনো সন্তানই আর তার মা-বাবার শেষ বয়সের আশ্রয় হতে চাইবে না।
এই ধরনের অমানবিক ঘটনার ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে কোনো সন্তানই মা-বাবাকে অবহেলা করার সাহস না পায়। ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন বাংলাদেশে বিদ্যমান থাকলেও এর প্রয়োগ এবং সচেতনতা একেবারেই নগণ্য। আইন যদি কঠোরভাবে কার্যকর না হয়, তবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং সমাজের এই পচন কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হবে না।
আইন থাকার পরও আমাদের নিথর প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা বা ধীরগতি অনেক সময় অপরাধীদের পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দেয়। এই ধরনের সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসনের উচিত স্বপ্রণোদিত হয়ে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে সমাজে একটি দৃষ্টান্তমূলক বার্তা পৌঁছায়। কেবল মরদেহ উদ্ধার করাই প্রশাসনের কাজ হওয়া উচিত নয়, বরং প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সামাজিক নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
আমাদের সমাজে এখনও প্রবীণদের অধিকার এবং সন্তানদের দায়িত্ব নিয়ে সচেতনতার ব্যাপক অভাব রয়েছে। অনেকেই জানেন না যে মা-বাবাকে অবহেলা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এর জন্য আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে। গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এই বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ধর্মীয় অনুশাসন থেকে বিচ্যুতিও এই নৈতিক অবক্ষয়ের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। সে জন্য প্রতিটি ধর্মই মা-বাবার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়। আধুনিকতার নামে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে তরুণ প্রজন্মের মনের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক শিক্ষার সমন্বয়ই পারে এই নৈতিক পতন থেকে আমাদের যুবসমাজকে রক্ষা করতে।
মিরপুরের এই ঘটনাটি আসলে আমাদের চারপাশের সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে চোখের সামনে নিয়ে এসেছে, যা আমরা সচরাচর এড়িয়ে যেতে চাই। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের চটকদার ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার সত্যের প্রতিচ্ছবি। এই নিষ্ঠুরতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমরা আসলে কতটা মেকি আর ভেতর থেকে কতটা ফাঁপা এক জীবনযাপন করছি।
এই ঘটনাটি কোনো একক পরিবারের গল্প নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সংকটের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। এই আত্মকেন্দ্রিক জীবন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা আজ গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। এই চরম অমানবিকতা ও নৈতিক পতন থেকে বাঁচতে হলে আমাদের এখনই ফিরে যেতে হবে আমাদের শিকড়ে, জাগ্রত করতে হবে মানবিক মূল্যবোধ, অন্যথায় আমরা এক উন্নত কিন্তু আত্মাহীন, মৃত জাতিতে পরিণত হব।
প্রাবন্ধিক
এএডি/