শিশু নির্যাতন রোধে বিচার প্রক্রিয়ায় দ্রুততা প্রয়োজন

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

মতামত

একটি রাষ্ট্রের প্রধান ও অন্যতম কাজ হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। যে রাষ্ট্র জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়,

2026-06-07T14:33:10+00:00
2026-06-07T14:33:10+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
মতামত
শিশু নির্যাতন রোধে বিচার প্রক্রিয়ায় দ্রুততা প্রয়োজন
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ২:৩৩ পিএম   (ভিজিট : ৩)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একটি রাষ্ট্রের প্রধান ও অন্যতম কাজ হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। যে রাষ্ট্র জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রের যাবতীয় উন্নয়ন-আধুনিকতা-পদক্ষেপ সবই অর্থহীন।

সে জন্য রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্য তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। 

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ব্যাপক হারে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
আরও পড়ুন

এ দেশে নারীরা আজ কোথাও নিরাপদ নেই। নারীরা ঘরে-বাইরে, শিক্ষাঙ্গনে, গণপরিবহনে, এমনকি কর্মক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও ধর্ষিত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ খবর হচ্ছে, নারী ও শিশুরা তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ দ্বারা নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। ছোট ছোট শিশুরা পরকীয়া সম্পর্কের জেরে নিজের মা কিংবা বাবার হাতে খুন হচ্ছে। যৌতুকের অভিশাপে স্বামীর হাতে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছে নারীরা। নারীরা উঠতি বয়সি কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। ইভটিজিংয়ের শিকার কিশোরীদের সম্মান রক্ষায় এগিয়ে আসায় বখাটের হাতে বাবা কিংবা ভাই হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা অহরহ সংঘটিত হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু অপরাধ নয়, বরং মানবিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই নিষ্পাপ শিশু নির্যাতনের হৃদয়বিদারক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। মানুষরূপী হায়েনারা ছোট ছোট অবুঝ বাচ্চাদেরও রেহায় দিচ্ছে না। একটি শিশু কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই তার সুন্দর জীবন শেষ করে দিচ্ছে। আমাদের সমাজে ভয়, সামাজিক অপমান, দুর্বল বিচারব্যবস্থা ও লোকলজ্জার কারণে নারী ও শিশুর অভিভাবকরা আইনের দ্বারস্থ হতে চায় না।

গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রামিসা হত্যার ঘটনা একটি পরিবার নয়, পুরো দেশকে মর্মাহত করেছে। প্রতিবেশীর বিকৃত লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারানো দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের বর্বরোচিত হত্যার ঘটনা পুরো দেশের মানুষের মধ্যে নিন্দার ঝড় ও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি উঠেছে। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার বুকফাটা হাহাকার আর বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম আক্ষেপের বাণী এখন পুরো এলাকার বাতাসে ভাসছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, বিচার চাই না, আপনারা কোনো বিচার করতে পারবেন না। এরপর আরেকটা বড় নৃশংস ঘটনা ঘটবে, কিছু দিন পর সেটাও ধামাচাপা পড়ে যাবে। প্রত্যেকটা আলোচিত ঘটনার পর মামলা হয়, বিক্ষোভ হয়, টকশো হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও হত্যা কেবল একটি সাধারণ ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের গভীর নৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মানবিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি। এটি হাজারো অপ্রকাশিত চাপা পড়ে থাকা ঘটনায় জড়িত শিশুর আর্তনাদের প্রতীক। রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর দেশব্যাপী মানুষের ক্ষোভ প্রমাণ করে তারা আর এই বর্বরতা ও বিচারহীনতা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। বাংলাদেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির বহিঃপ্রকাশ। অপরাধ করার পরও অধিকাংশ অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয় না। মামলা চলাকালেই জামিনে বেরিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে অনেক আসামি।

বিগত কয়েক বছর ধরে নারী ও শিশু নির্যাতনের সংখ্যা মারাত্মক হারে বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের হিসাব মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৫৮০ শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩২৬টি। এক মাসের ব্যবধানে সহিংসতার চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত এক দশকে ৫ হাজার ৬০০ শর বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, নারী ও শিশু ধর্ষণ হত্যা মামলার বিচারে ৩০ শতাংশ অপরাধী শাস্তি পাচ্ছে। খালাস পেয়ে যাচ্ছে ৭০ শতাংশ অপরাধী। অধিকাংশ মামলা বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে খারিজ হয়ে যায়। কখনো ঝুলে থাকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী ৬ মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকলেও মামলা শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। মামলা জট, তদন্তে ধীরগতি, বদলিজনিত সমস্যা, পুলিশের দুর্নীতি, ঘুষ, বাদীপক্ষের নারাজি, পুনঃতদন্ত, আসামিপক্ষের প্রভাব, ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট সহজে হাতে না পাওয়াসহ নানা কারণে সময় লাগে বেশি। সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন মামলা দেড় লাখের বেশি। ২০০৯ সাল হতে এখন পর্যন্ত দলবদ্ধ ও এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র ৫ জনের মৃত্যু কার্যকর হয়েছে। একই অপরাধে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত দেড়শ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে। তাদের রায় কখন কার্যকর হবে কেউ জানে না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ফওজিয়া করিম বলেন, যৌন হয়রানি বা এ সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। যে আইন আছে মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণে তার যথাযথ প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের দিনের পর দিন নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে উপযুক্ত আইন ও প্রয়োগের অভাব। উপযুক্ত আইন ও প্রয়োগের অভাবে আসামিরা দ্রুত সময়ে জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধ জগতে লিপ্ত হচ্ছে। মাদকের সহজলভ্যতা মানুষকে নতুন নতুন অপরাধে ধাবিত করছে। দুর্বল তদন্ত ও রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থের প্রভাবের কারণে হত্যা মামলার  আসামিরা আদালত থেকে খলাস পেয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব, সামাজিক অবক্ষয়, বিচারহীনতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও ধীরগতি, মাদকের বিস্তার, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি কারণে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। নারী-শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে আরও মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। নারীর নিরাপত্তা মানে সমাজের নিরাপত্তা। তাই প্রতিটি নারী ও শিশুকে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব।

 সমাজের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই ধরনের জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি রুখতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি সর্বনিম্ন শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসি ঘোষণা করতে হবে। শুধু অপরাধীকে শাস্তি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যাতে কেউ এই জঘন্য কাজ করার সাহস না পায়। এ জন্য জনসচেতনতার পাশাপাশি কঠোর আইন, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা না কমার অন্যতম কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এ দেশে আইন সবার জন্য সমান নয়। বেশিরভাগ ঘটনায় প্রভাবশালী অপরাধীরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। আমাদের দেশেও কঠোর আইন প্রয়োগ করে দ্রুত নারী নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা দরকার। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ তৈরি করতে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দেশে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় শরিয়াহ আইন চালু করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

খুন, ধর্ষণ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শরিয়াহ আইনে বিচার করতে হবে। প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আর আস্থা নেই। শরিয়াহ আইনে বিচার হলে দেশে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি একদম কমে যাবে।

প্রাবন্ধিক

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: