আকাশচুম্বী এক বটবৃক্ষ, যার ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে তৈরি করেছে এক বিশাল প্রাকৃতিক ছাউনি। সেই গাছের নিচেই পরম শান্তিতে বসে কেনাবেচার ধুম। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছুই বদলে গেলেও নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে শত বছরের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে এখনো জমে ওঠে ‘রতডাঙ্গার হাট’। জেলা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের রতডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত এই হাটটি এখনো গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই হাটের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে চিত্রা নদীর পাড়ে এই হাটের পত্তন ঘটে। এক সময় চিত্রা নদী দিয়ে চলাচল করত বড় বড় নৌকা, ট্রলার, লঞ্চ ও স্টিমার। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা নৌপথে এই হাটে আসতেন এবং দিনভর কেনা-বেচা শেষে সবজি, মাছ, মাংস, গুড় ও মাটির তৈজসপত্র নিয়ে আবার নৌপথেই ফিরে যেতেন। কালের বিবর্তনে নদীপথের সেই জৌলুস কমলেও হাটের গুরুত্ব এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও সোমবার এখানে বসে অফিশিয়াল হাট। তবে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও সকাল-সন্ধ্যা বসে নিয়মিত বাজার। রতডাঙ্গা ও এর আশপাশের ৪-৫টি গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের চাহিদার কেন্দ্রবিন্দু এই হাট। সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, হাটের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সেই বিশাল বটগাছ। এর নিচে কেউ স্থায়ী দোকানপাট দিয়েছেন, কেউবা খাটাচ্ছেন অস্থায়ী ছাউনি।
বটতলার শীতল ছায়ায় ৩৫ বছর ধরে পান বিক্রি করছেন অখিল বিশ্বাস (৬৫)। তিনি বলেন, আমার বাবা-দাদারাও এই গাছটিকে এমন বিশালই দেখে গেছেন। কে এই গাছ লাগিয়েছিলেন কেউ জানে না। এই গাছের ছায়াই আমাদের রুটি-রুজির আশ্রয়। একই স্থানে অস্থায়ী সেলুন বসিয়ে চুল-দাড়ি কাটেন হারান পরামানিক। তীব্র গরমেও এই বটতলার ঠান্ডা পরিবেশে মানুষ পরম শান্তিতে চুল কাটাতে আসেন বলে জানান তিনি। এছাড়াও ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে কাঁচা সবজি বিক্রি করছেন ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ রুহুল আমিন।
হাটের পাশেই গড়ে উঠেছে রতডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। টিফিনের সময় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এই বটতলা। শুধু গ্রামবাসীই নন, শহরের তরুণদের কাছেও এটি একটি দারুণ আড্ডাস্থল।
নড়াইল পৌর এলাকা থেকে হাটে আসা আজিজুল ইসলাম (২৮) জানান, ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে নৌকায় করে এই হাটে আসতেন, সেই টান আজও রয়ে গেছে। তিনি হাসিমুখে বলেন, এই হাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো মাত্র আড়াই টাকায় পাওয়া মচমচে ও সুস্বাদু শিঙাড়া! বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই এখানে আসি সবজি কিনতে আর বটতলায় আড্ডা দিতে।
ঐতিহাসিক এই বটগাছটি রক্ষায় রতডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা একতাবদ্ধ হয়ে গঠন করেছেন ২০ সদস্যের রতডাঙ্গা বাজার বটগাছ সংরক্ষণ কমিটি। কমিটির সভাপতি জাহিদ হোসেন জানান, গাছটি সম্ভবত ৫ থেকে ৬ শত বছরের পুরোনো। আমাদের বাবা-দাদারাও একে একই রূপে দেখেছেন। বাজারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই গাছটি। কেউ যাতে এর ডালপালা কাটতে বা ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য আমরা এটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করি।
চন্ডিবরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজ ভুঁইয়া বলেন, দেশীয় ফল, মাছ, সবজি ও গুড়ের জন্য রতডাঙ্গার হাট বহুকাল ধরে বিখ্যাত। চিত্রা নদীর হাওয়া আর এই বটবৃক্ষের শীতল ছায়ার কারণে এখানে আসা মানুষের কখনো বৈদ্যুতিক ফ্যানের প্রয়োজন হয় না। এটি আমাদের অঞ্চলের এক গর্ব।
সময়ের আলো/জোই