প্রাক্কলিত ব্যয়ের যথার্থতা নিশ্চিত করবে কে?

মো. মামুনুর রশিদ মণ্ডল

মতামত

বিদ্যুৎ একটি মৌলিক জনসেবা। আধুনিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুতের

2026-06-08T14:26:40+00:00
2026-06-08T14:26:40+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
মতামত
বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে জনস্বার্থ
প্রাক্কলিত ব্যয়ের যথার্থতা নিশ্চিত করবে কে?
মো. মামুনুর রশিদ মণ্ডল
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ২:২৬ পিএম   (ভিজিট : ১৬)
সংগৃহীত ছবি
বিদ্যুৎ একটি মৌলিক জনসেবা। আধুনিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বিদ্যুতের খুচরা মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যয়ের সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় সমন্বয় করে মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। তবে বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত ক্রয়মূল্য নিয়ে যেমন দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক বিদ্যমান, তেমনি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়ের প্রাক্কলিত অঙ্কের যথার্থতা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়ে আসছে।

গত ৩ জুন ২০২৬ তারিখে বিপিডিবি যে খুচরা বিদ্যুৎ মূল্য নির্ধারণ করেছে, তা মূলত ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক্কলিত ব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু এই প্রাক্কলিত ব্যয়ের যথার্থতা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয়কৃত ব্যয় বাস্তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে কি না তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য সংশ্লিষ্ট অর্থবছর শেষ হওয়া এবং পরবর্তী নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আরও পড়ুন

তবে প্রাক্কলিত ব্যয়ের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য অতীতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে দাখিলকৃত বিদ্যুতের খুচরা মূল্য আবেদন নং-৭৯৭৭ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রাক্কলিত এবং প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল। বিপিডিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জনবল ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৪,২৩৪ মিলিয়ন টাকা, কিন্তু প্রকৃত ব্যয় হয় ৩,৮৪৪ মিলিয়ন টাকা, যা প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম। একইভাবে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ১,৩৬১ মিলিয়ন টাকা প্রাক্কলন করা হলেও প্রকৃত ব্যয় হয় ১,৩৩০ মিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২.৩ শতাংশ কম। একইভাবে অবচয় ব্যয়ও প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কম ছিল।

যদিও আর্থিক প্রতিবেদনে অন্যান্য ব্যয় খাতের বিস্তারিত তথ্য সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট নয়, তথাপি যদি সেসব খাতেও অনুরূপ ব্যয় হ্রাস ঘটে থাকে, তবে যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ ও প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ কি আদৌ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি অপরিহার্য করে তোলে?

সুতরাং, একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় কতটা যৌক্তিক ও নির্ভরযোগ্য? এবং এই ব্যয়ের যথার্থতা নিশ্চিত করবে কে?

প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ শুধু পূর্ববর্তী এক বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়। বরং একাধিক বছরের প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা, উৎপাদন দক্ষতা, সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক প্রাক্কলন প্রস্তুত করা প্রয়োজন।

মূল্যবৃদ্ধি যেমন একটি সমস্যা, তেমনি অযাচিত ব্যয় বৃদ্ধি আরেকটি বড় সমস্যা। আর এখানেই জনস্বার্থের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জনগণকে জানার অধিকার থাকতে হবে যেকোনো ব্যয়ের ভিত্তিতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বা সমন্বয় করা হচ্ছে এবং সেই ব্যয় কতটা যৌক্তিক ও নির্ভরযোগ্য। যদি ব্যয় নির্ধারণের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই না হয়, তা হলে জনস্বার্থ সুরক্ষিত হয় না। এর ফলে সাধারণ ভোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিল্প খাত অযৌক্তিক আর্থিক চাপের সম্মুখীন হতে পারে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দায়িত্ব শুধু সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা নয়; একই সঙ্গে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করাও তাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এ জন্য ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য, প্রাক্কলনের ভিত্তি এবং মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক যাচাই করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। এতে জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হবে।

আমাদের সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় প্রায়ই লক্ষ করা যায় যে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেলে ব্যয়ও অনুরূপভাবে বৃদ্ধি পায়। ব্যয় সংকোচন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যয় সম্প্রসারণই যেন প্রধান নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান। ফলে প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে- জনস্বার্থ নিশ্চিত করবে কে?

প্রতিবেশী ভারতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন (ঈঊজঈ) বিদ্যমান থাকলেও জনস্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে স্বাধীন নিরীক্ষক হিসেবে ঈগঅ পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়েছে। কারণ, মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত তথ্য ও উপাত্ত কেবল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; সেগুলোর যথার্থতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং যৌক্তিকতা যাচাইয়ের জন্য যেমন পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন উচ্চমানের পেশাগত দক্ষতা ও স্বাধীন মূল্যায়ন।

একজন স্বাধীন পেশাজীবী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং জনস্বার্থের রক্ষক হিসেবে তথ্যের নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই করে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারেন।

সর্বোপরি, প্রাক্কলিত (আনুমানিক) ব্যয় যদি বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের মূল ভিত্তি হয়, তবে সেই ব্যয়ের যথার্থতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী স্বাধীন যাচাই ব্যবস্থা অপরিহার্য। অন্যথায় জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং পেশাগতভাবে যাচাইকৃত ব্যয় তথ্যই পারে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে জনগণের আস্থা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে।

অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিদিশা গ্রুপ

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: