জলবায়ু সংকট এখন শ্রম, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন ও মানবাধিকার চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সমন্বিত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু-সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক উদাহরণ স্থাপন করতে পারে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সোমবার (৮ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ ও শ্রমিক নেতারা এসব তথ্য ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
‘জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ : টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের যৌথ আয়োজন করে ‘ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ’ (এনএজেটিবি) এবং ‘সাসটেইনেবল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন’ (এসএমইপি) প্রোগ্রাম।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনএজেটিবির নির্বাহী সমন্বয়ক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের (বিএলএফ) প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রাইসুল ইসলাম খান বলেন, জলবায়ু সংকট এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি শ্রম ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে।
মূল উপস্থাপনায় বিএলএফ-এর প্রোগ্রাম অফিসার মো. জুবায়ের আলম জানান, ২০২৪ সালের তীব্র তাপপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন-আগস্ট সময়ে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ, যা চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে।
আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন, চরম তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ সংকট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে দেশের শ্রমজীবী মানুষ প্রতিকূল কর্মপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে শ্রমিকদের মাঝে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের শিল্পনীতিতে শুধু উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও শ্রমিকদের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনাকে কার্যত উপেক্ষা করা হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের চেয়ারপারসন কুতুবউদ্দিন আহমেদ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ দিয়ে বলেন, প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো শিল্প টেকসই হতে পারে না।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুধু মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে। এখন অস্তিত্ব রক্ষার্থেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এদিকে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির কল্পনা আক্তার বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে বলেন, তারা গ্রিন ফ্যাক্টরির কথা বললেও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করছে না— এই দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া দরকার।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের সোহানুর রহমান সিসাজনিত কারণে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশুর বুদ্ধিবিকাশ ব্যাহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
অন্যদিকে, জেটনেট-এর ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে কৃষিজমির পরিবর্তে অনাবাদি জমি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক স্লোগানের বাস্তব প্রতিফলন শ্রমিকদের জীবনে দেখা যায় না। তিনি সামাজিক নিরাপত্তা, জলবায়ু-সহনশীল আবাসন ও নিরাপদ গণপরিবহণকে শ্রমিকদের যৌথ দরকষাকষির (সিবিএ) অংশ করার আহ্বান জানান। একই সাথে বৈশ্বিক জলবায়ু ফোরামে বাংলাদেশের শ্রমিকদের সুস্পষ্ট দাবি তুলে ধরার তাগিদ দেন তিনি।
সংকট উত্তরণে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা— কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক তাপ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, নগর সবুজায়ন, জলাধার পুনরুদ্ধার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জোর দাবি জানান।
সময়ের আলো/জেডি