আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেটটি আসতে যাচ্ছে, নানা কারণে সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বিগত কয়েক বছরের ভঙ্গুর অর্থনীতি টেনে তোলার অনেক উপকরণ রাখতে হবে এই বাজেটে। একইভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের মানুষ যেভাবে পিস্ট হচ্ছে, সেখান থেকে পরিত্রাণ দিতেও বাজেটে বেশ কিছু ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দেশের উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে যেভাবে হাত গুটিয়ে রেখেছেন, তারা যাতে আবার বিনিয়োগের ডালি নিয়ে নেমে পড়েন তার জন্যও বাজেট পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যে রকম অস্থিরতা চলছে সেখানেও শৃঙ্খলা ফেরানোর মতো দিকনির্দেশনা থাকতে হবে বাজেটে। আরও বেশ কয়েকটি দিকে নজর দিতে হবে আসন্ন নতুন বাজেটে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সরকারকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে বিগত দুই সরকারের আমলে নেওয়া বিশাল ঋণের সুদ পরিশোধের বিষয়টিকেও। অর্থাৎ পুরোনো ঋণের বোঝা টানতে হবে আগামী বাজেটেও। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের দায় শোধেই যাবে সোয়া লাখ কোটি টাকা, যা বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২৬-২৭ বাজেটটা হবে ‘পুরোনো ঋণ শোধের বাজেট’। উন্নয়নের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে প্রায়োরিটি দেওয়া হয়েছে। আয় বাড়াতে না পারলে ঋণ পরিশোধই বড় চ্যালেঞ্জ হবে আগামী বাজেটে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘নানা কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট দেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে বড় তিনটি বিষয় হচ্ছে- দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার জন্য আগামী বাজেট হবে মূল নিয়ামক। কারণ অর্থনীতির প্রতিটি খাতের চরম দুরাবস্থা চলে আসছে বিগত কয়েক বছর ধরে।
সেই ভাঙাচোরা অর্থনীতি মেরামত করতে হবে এই বাজেটের মাধ্যমে। এরপর উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমানোর দিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আবার বিনিয়োগ খরা কাটানোর মতোও অনেক উপকরণ রাখতে হবে বাজেটে। অর্থনীতির এসব গুরুত্বপূর্ণ খাতে যেখানে বেশি নজর দিতে হবে সেখানে আগের সরকারের আমলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা টানতে হবে সরকারকে।
এসব ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বাজেটের বড় একটা অংশ বরাদ্দ রাখতে হবে সরকারকে। অথচ এই সুদ যদি কম হতো তা হলে অর্থনীতির অন্য খাতে সে অর্থ ব্যয় করা যেত।’
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের প্রায় ১৩.৫৪ শতাংশ। উন্নয়ন ব্যয়ের পর এটিই সরকারের অন্যতম বৃহৎ ব্যয় খাত হয়ে উঠেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন বাস্তব চাপে রূপ নিয়েছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, রাজস্ব ঘাটতি এবং চলতি ব্যয়ের চাপ একত্রে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। সেই ঋণের সুদ পরিশোধই এখন বাজেটের বড় অংশ দখল করছে।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
কেন এত ঋণ পরিশোধ :
মহামারি করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালে মোটা অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। এ ছাড়া বড় বড় মেগা প্রকল্পের জন্যও প্রচুর ঋণ নেয় বিগত সরকার। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস, সারে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। ভর্তুকি দিতে গিয়েও সরকার ঋণ নিয়েছে। এ ছাড়া ডলার সংকটের কারণে ডলারের দাম বাড়ায় বিদেশি ঋণের টাকা পরিশোধ করতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। এসব কারণেই ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হবে বেশি।
এদিকে সুদ ব্যয় কমানোর একমাত্র সমাধান হিসেবে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাজেটে ক্রমবর্ধমান সুদ ব্যয় আর্থিক শৃঙ্খলায় চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতি বছর সরকারকে তার ব্যয় মেটাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ করতে হচ্ছে। এই ঋণ দুভাবে নেওয়া হয়- দেশীয় খাত এবং বিদেশি ঋণও নিতে হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সুদ খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আগামী দুই অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সুদ খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং ১ লাখ ৬১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সুদ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকারের ঋণ অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে সংশোধিত বাজেটে সুদ খাতে ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। সরকারের ঋণ কমিয়ে আনতে না পারলে আগামী অর্থবছরেও প্রাক্কলনের চেয়ে সুদ খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
অর্থ বিভাগের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঋণের ওপর সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আয়ের তুলনায় সুদ পরিশোধের খাতে ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়াই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ গ্রহণের পরিমাণও বেড়েছে।
একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধির ফলে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এখন শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে।
বিদেশি ঋণের সুদ ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থাপনা শুধু আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই নয়, বরং এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক ঋণমান বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন সম্ভাবনা সুরক্ষিত রাখার জন্য অপরিহার্য।
সম্প্রতি বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণ যে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা এই বিষয়টির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।
সময়ের আলো/জেডি