আইন ভেঙেই আল-আরাফাহ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে কেডিএস গ্রুপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুরোনো উদ্যোক্তা ও বিতর্কিত কেডিএস গ্রুপের হাতে তুলে দিয়েছে বলে

2026-07-31T21:57:25+00:00
2026-07-31T21:57:25+00:00
 
  শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬,
১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
আইন ভেঙেই আল-আরাফাহ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে কেডিএস গ্রুপ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুরোনো উদ্যোক্তা ও বিতর্কিত কেডিএস গ্রুপের হাতে তুলে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুনর্গঠিত এই পর্ষদে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়াও ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘনের দায়ে বাদ দেওয়া হয়েছে দুই পরিচালককে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অনিয়মে অভিযুক্তদের পুনর্বাসনের তোড়জোড় এবং একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠায় ব্যাংকটিতে নতুন করে চরম অস্থিরতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক। 

পর্ষদ গঠনের মাত্র দুই দিনের মাথায় ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘনের দায়ে দুই পরিচালককে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই পর্ষদের কতিপয় সদস্যের ছত্রছায়ায় আগে নানা অনিয়মে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা শুরু হয়েছে। 

নবগঠিত পর্ষদের প্রথম সভাতেই বিতর্কিত ও চাকরিচ্যুত অনেক কর্মকর্তার ছিল উপস্থিতি। একই সঙ্গে পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ব্যাংকটির একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) পদত্যাগে বাধ্য করার গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। 

চাপের মুখে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর ও আইন লঙ্ঘনের ঘটনা

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে খাজা শাহরিয়ারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ বসিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে আবারও পর্ষদ গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়। ২ শতাংশ শেয়ার থাকা দুটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হয়ে ওঠে- যার একটি কেডিএস গ্রুপ এবং অন্যটি বর্তমান ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের অনুসারী অংশ।

শেষ পর্যন্ত সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি চাপে ১৫ জুলাই কেডিএস গ্রুপের পছন্দমতো ব্যক্তি ও আত্মীয়স্বজনদের পর্ষদে বসায় বাংলাদেশ ব্যাংক। শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে যে ১৪ জনকে পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ৬ জনই ছিলেন কেডিএস গ্রুপের শীর্ষ নেতৃত্ব ও তাদের সরাসরি আত্মীয়। এ ছাড়া ব্যাংকের নতুন নির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমানসহ বেশ কয়েকজন পরিচালক কেডিএস পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

তবে আইন অনুযায়ী এক পরিবার বা একক গ্রুপ থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ না থাকায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে কেডিএস প্রতিনিধি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিমকে পর্ষদ থেকে বাদ দিয়ে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। 

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, স্বতন্ত্র পর্ষদ দিয়ে ব্যাংকটি ভালোই চলছিল। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপে বাধ্য হয়ে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের হাতে ব্যাংকটি তুলে দিতে হয়েছে, যা শুভসূচনা হলো না।

প্রথম সভাতেই বিশৃঙ্খলা ও ডিএমডিকে অপসারণের অভিযোগ

নতুন পর্ষদ গঠনের পরদিনই অনুষ্ঠিত জরুরি সভা ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ১৯ জন পরিচালকের উপস্থিতিতে সর্বাধিক ২৫ জনের সমাবেশ হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ৪০ জনের বেশি উপস্থিত ছিলেন। সভায় আগে অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়, যেখানে স্বতন্ত্র পরিচালকেরা নীরব ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হন।

অভিযোগ উঠেছে, কেডিএস গ্রুপের শীর্ষ ব্যক্তি ও নতুন পর্ষদ কর্তাদের নির্দেশে ইতোমধ্যে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মোহাম্মদ হোসেনকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, পর্ষদ সভার দিন উৎসুক অনেকেই দেখা করতে এসেছিলেন, তাই পরিবেশটা একটু ভিন্ন ছিল। আর ডিএমডি নিজের ইচ্ছাতেই পদত্যাগ করেছেন, আমরা কোনো চাপ দিইনি। 

তিনি আরও দাবি করেন, ব্যাংকটিকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনা করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই তার মূল কাজ হবে।

কেডিএস পরিবারের অতীত অনিয়ম ও অডিট প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কেডিএস গ্রুপের কর্তাব্যক্তিদের নানা আর্থিক অনিয়মের চিত্র। 

জানা গেছে, ২০২২ সালে তৎকালীন ব্যাংক চেয়ারম্যান ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমানের (বর্তমানে নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান) ব্যবহারের জন্য ১ কোটি টাকা সীমার মধ্যে গাড়ি কেনার অনুমোদন দেয় পর্ষদ। কিন্তু আইন ও অনুমোদন তোয়াক্কা না করে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকায় একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কেনা হয়। পরবর্তীতে একই প্রক্রিয়ায় এস আলমের ভাই আবদুস সামাদ লাবুর জন্য কোনো অনুমোদন ছাড়াই ৩ কোটি ২৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় আরও একটি মার্সিডিজ কেনা হয়।

গাড়ি দুটি ক্রয়ের তথ্য ও অর্থের গতিবিধি আড়াল করতে ব্যাংকের নিজস্ব নামে নিবন্ধন না করে এআইবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ও এআইবিএল ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস নামের দুটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নামে কেনা হয়। গাড়িগুলোর কোনো ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টারে ভুক্তি ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারিতে পরবর্তীতে গাড়ি দুটি ব্যাংকের হেফাজতে নেওয়া হয়।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংক দখলের পর সেটির চেয়ারম্যান হন। পরবর্তীতে অনিয়মের কারণে তাকে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলও খাটেন তিনি। 


জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য বর্তমানে বেশ নাজুক। উচ্চ খেলাপির কারণে পরপর দুই বছর (২০২৪ ও ২০২৫) শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে না পেরে ব্যাংকটি এখন শেয়ারবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। ব্যাংকটির মোট আমানত ৫৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার (ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত) বিপরীতে মোট ঋণ বা বিনিয়োগ রেেছ ৫০ হাজার ১২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৭.৬১ শতাংশই খেলাপি ঋণ।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ব্যাংকিং খাতে ক্ষমতার এই পালাবদলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শেয়ারধারী পরিচালকেরা ব্যাংক পরিচালনা করবেন এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা না করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুনরায় দায়িত্বে আনা চরম ভুল সিদ্ধান্ত। আমানতকারীরা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আবারও কোনো রাজনৈতিক বা গোষ্ঠী স্বার্থের প্রভাবে পরিচালিত হয়, তবে তা পুরো আর্থিক খাতের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   আইন ভেঙে  আল-আরাফাহ ব্যাংক  নিয়ন্ত্রণ  কেডিএস গ্রুপ 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: