ছয় দশক আগে রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ান নৌপথে বাণিজ্য চলত। কিন্তু ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধসহ অভ্যন্তরীণ নানা কারণে নৌপথ ও নদীবন্দর বন্ধ হয়ে যায়। সেই নৌপথে আবারও বাণিজ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় দীর্ঘ ৫৯ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।
এই নৌবন্দরে আবারও শুরু হয় পণ্য আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। কিন্তু চলে মাত্র ১০ দিন। এ সময় পাঁচটি নৌযানে আমদানি-রফতানি করা হয় পাথর ও গার্মেন্টস ঝুট। এরপর পদ্মা নদীর নাব্যতা সংকটে আবারও বন্ধ হয়ে যায় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শনকালে অবকাঠামো উন্নয়ন করে দ্রুত এটি চালুর নির্দেশনা দেন। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বারবার চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও এই বন্দরটি আলোর মুখ দেখছে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। বিআইডব্লিউটিএ এবং এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরের মতামতের ভিত্তিতে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারপ্রধান চাইলে এই বন্দর দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম দ্রুতই চালু করা হবে।
এ প্রঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও এনবিআর কেন এই নৌবন্দরের চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছে না তা উদ্বেগজনক। নৌবন্দর চালু না করার পেছনে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো স্বার্থ রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার। তা না হলে এতদিনে জমজমাট থাকত গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরটি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় নদীপথে দুদেশের মধ্যে কম খরচে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই উপকৃত হবেন। বিভিন্ন পণ্য আনা-নেওয়ায় সুলতানগঞ্জ-মায়া নৌরুট হয়ে উঠতে পারে লাভজনক একটি ক্ষেত্র।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি শামসুর রহমান বলেন, এই নৌবন্দর চালু হলে সরকার যেমন রাজস্ব আদায় করবে, তেমনি ব্যবসায়িক জোন হিসেবে গড়ে উঠবে এই অঞ্চল। এই অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল হবে নৌবন্দর কেন্দ্র করে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বন্দরটি চালু হলে পণ্য আমদানিতে ২০-২৫ শতাংশ ব্যয় কমবে। এ ছাড়া অনেক সময় কম লাগবে পণ্য আনা-নেওয়ায়। বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এই নৌবন্দর ঘিরে।
আমদানি ও রফতানিকারকদের অভিযোগ, নদী ড্রেজিং ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করার পরও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরের পানামা ও এনবিআরের গা ছাড়া ভাবের কারণে ঝুলে আছে এই বন্দরের ভাগ্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমসের দাবি অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতেও প্রস্তুত উদ্যোক্তারা।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবেই স্থবির হয়েছে বন্দরটি। তবে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হলেও বন্দরটি নিয়ে আশাবাদী বিআইডব্লিউটিএ।
পাথর আমদানিকারক আমিনুল ইসলাম বলেন, এই নৌবন্দরে ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। আমার ৩টি পণ্যবাহী জাহাজ সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরে মাসের পর মাস পড়ে আছে। প্রতি মাসে ১৫ লাখ টাকা করে তাদের ভাড়া বাবদ দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রুত বন্দরটি চালু না হলে ব্যবসায়ীরা চরম বেকায়দায় পড়বেন।
তিনি আরও বলেন, ভারত থেকে লাখ লাখ টন পাথর বাংলাদেশে আনতে হয় সড়কপথে বা ট্রেনে। এতে খরচও বেশি হয়। নৌপথে পাথর আনতে পারলে খরচ অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি এ নৌরুটটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। বর্ষাকালে দুই থেকে আড়াই হাজার টন কার্গো যাতায়াত করতে পারবে। আর খরা মৌসুমে সেটি ৭০০ থেকে ৮০০ টনে দাঁড়াবে।
আরেক আমদানিকারক সুলতানুল ইসলাম বলেন, স্থলবন্দরের লোকজন মনে করে, এই বন্দরটি চালু হলে তাদের ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাবে। এটি ভুল ধারণা। যার যেদিক দিয়ে সুবিধা হবে সেদিক দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া করবেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জের সঙ্গে ভারতের মুর্শিদাবাদের মায়া নৌবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। এই নৌপথ চালু হলে ভারত থেকে সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল, পাথর, মার্বেল, খনিজ বালু ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী বাংলাদেশে আসবে। বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, মাছ, পাট ও পাটজাত পণ্য ছাড়াও বিভিন্ন কৃষিপণ্য ভারতে যাবে।
এসব পণ্য মূলত বিভিন্ন স্থলবন্দরের মাধ্যমে সড়ক ও রেলপথে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। এতে সময় ও খরচ অনেক বেশি লাগে। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য ভারত থেকে আমদানিতে সময় ও খরচ কম হবে। এতে উপকৃত হবেন দেশের ব্যবসায়ীরা।
এর আগে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশের সুলতানগঞ্জ আর পশ্চিমবঙ্গের ধূলিয়ান নৌরুটে বাণিজ্য চালুর। রাজশাহী থেকে মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ান পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার একটি নৌপথের অনুমোদন থাকলেও পদ্মা নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে কার্যকর করা যায়নি। পরে সিদ্ধান্ত হয় রুটটি সুলতানগঞ্জ থেকে মায়া নৌবন্দর পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত করার।
আড়াআড়িভাবে ২০ কিলোমিটার পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ ঘাটে পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। প্রস্তুত করা হয়েছে পন্টুনও। পাশেই রাখা হয়েছে বিশাল আকৃতির একটি ট্রলার। ওই ট্রলার দিয়েই পণ্য পাঠানোর কথা রয়েছে ভারতে।
সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের ঘাটটি রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক থেকে ১ কিলোমিটার দক্ষিণের পদ্মার শাখা নদী মহানন্দার মোহনার কাছাকাছি। সুলতানগঞ্জের এই পয়েন্টে সাধারণত সারা বছরই গভীর পানি থাকে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মায়া নৌবন্দরটি মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমা শহরের কাছে ভারতীয় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের সঙ্গে যুক্ত।
ফলে সুলতানগঞ্জ-মায়া পথে নৌবাণিজ্য শুরু হলে পণ্য পরিবহন খরচও যেমন অনেক কমবে, তেমনি এই নৌবন্দরটি চালু হলে এই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেই সঙ্গে সুলতানগঞ্জ ঘাটটি নদীবন্দরের মর্যাদা পাবে।
সময়ের আলো/জেডি