ইট-কাঠ-পাথরের এই ব্যস্ত শহরে জীবনটা মাঝেমধ্যে অদ্ভুত রকমের একঘেয়ে হয়ে ওঠে। প্রতিদিন একই চেনা রাস্তায় যান্ত্রিক হাঁটা, অন্তহীন যানজটে আটকে থাকা, আর অফিস কিংবা ক্লাসের জন্য অবিরাম ছুটোছুটি- এ যেন এক বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ।
নাগরিক কোলাহলের এই অবরুদ্ধ আবহাওয়ায় যখন দম আটকে আসার উপক্রম, তখন মানুষের মন একটু পাহাড় খুঁজতে থাকে, একটু সবুজের ছোঁয়া আর সুনীল জলরাশির সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এমনই এক পরিশ্রান্ত মুহূর্তে, সব নাগরিক ব্যস্ততাকে একপাশে সরিয়ে রেখে আমরা রওনা দিয়েছিলাম পাহাড়ের চিরন্তন ডাকে সাড়া দিয়ে।
আমাদের গন্তব্য ছিল নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙামাটি। তবে চিরাচরিত পর্যটকদের মতো একের পর এক স্পট ঘুরে দেখার কোনো তাড়াহুড়ো আমাদের ছিল না; ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সবুজ প্রকৃতি আর শান্ত জলের বুকে হারিয়ে গিয়ে কিছুটা মানসিক প্রশান্তি।
সময় যেখানে থমকে দাঁড়ায়
ভ্রমণের শুরুতেই কাপ্তাই লেক তার অসামান্য রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হলো। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই কৃত্রিম লেকটি প্রথম দেখাতেই যে কারও মন কেড়ে নিতে বাধ্য। চারপাশের সবুজ পাহাড়, শান্ত জলরাশি আর দূরে মাঝিদের ছোট ছোট নৌকার ধীরগতির চলাচল- সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা এক প্রশান্তির।
কাপ্তাইয়ে এসে সবচেয়ে যে বিষয়টি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, তা হলো এখানকার তাড়াহুড়াহীন, শান্ত ও সহজ জনজীবন। শহুরে জীবনের সেই তীব্র প্রতিযোগিতা আর ঘড়ির কাঁটার তাড়া এখানে এসে পুরোপুরি উধাও। লেকের বুকে কিছু দূর পরপর জেগে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ, সেখানে পাহাড়িদের দুয়েকটা কাঠের ঘর, স্থানীয়দের ফলমূলের বাগান কিংবা শান্ত পরিবেশের কোনো ইকো-রিসোর্ট সব মিলিয়ে এক নীরব ও অকৃত্রিম সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে।
আতিথেয়তা আর প্রকৃতির মেলবন্ধন
কাপ্তাই ও রাঙামাটির স্থানীয় পাহাড়ি মানুষদের অকৃত্রিম আন্তরিকতায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। কেউ পথে স্নেহ করে হাতে তুলে দিল সদ্য গাছ থেকে পাড়া বরই কিংবা কলা। টাকা দিতে সাহস হয়নি। প্রকৃতির এই অকৃত্রিম মায়া আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মূল্য কি টাকা দিয়ে শোধ করা যায়?
লেকে নৌভ্রমণের সময় নিথর জলের বুকে যখন বিশাল পাহাড়গুলোর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তখন মনে হয় যেন দুটো আকাশ আর দুটো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে আমাদের নৌকাটি এগিয়ে চলেছে। বিকালের হালকা ঠান্ডা বাতাস, মেঘের ফাঁক গলে আসা নরম সূর্যের আলো- সব মিলিয়ে শহরের ধুলোবালিতে ক্লান্ত হয়ে পড়া মনটা ধীরে ধীরে সতেজ হয়ে উঠছিল।
কাপ্তাইয়ের এই গভীর নীরবতা যেন খুব জোরে কথা বলে; মনের ভেতরের সব কোলাহলকে এক নিমেষে স্তব্ধ করে দেয়। যারা যান্ত্রিক জীবনের মানসিক ক্লান্তি দূর করার জন্য একটি নিভৃত কোণ খুঁজছেন, তাদের জন্য কাপ্তাই নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ জায়গা।
ডায়েরির পাতা থেকে
আমাদের ভ্রমণের প্রথম দিনটি কেটেছিল আশপাশের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ আর স্থানীয় বাজারের শান্ত জনজীবন দেখে। কেনাকাটা বলতে জুমের টাটকা ফলমূল আর ঐতিহ্যবাহী কিছু জিনিসপত্র। বিকাল হতেই আমরা চলে গেলাম বহুল প্রতীক্ষিত কায়াকিং করতে।
কাপ্তাই লেকের শান্ত জলে কায়াক ভাসিয়ে সূর্যাস্ত দেখার সেই অনুভূতি আজীবন মনে রাখার মতো। চারদিকে গোধূলির আলো, পাহাড়ের আড়াল থেকে পাখির কিচিরমিচির, লেকের দূর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কোনো এক মাঝির উদাসী গানের সুর- সব মিলিয়ে এক অচেনা, মায়াবী জীবনের ডাক অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে কোনো তাড়া নেই, নেই কোনো ই-মেইলের উত্তর দেওয়ার দায়বদ্ধতা।
পরদিন আমরা একটি বোট ভাড়া করে সারা দিনের জন্য লেকে ভেসে বেড়ালাম। প্রথমে গেলাম জিবতলী নারিকেল বাগান রিসোর্টে। রিসোর্টটি সাময়িক বন্ধ থাকলেও স্থানীয় কেয়ারটেকারদের আন্তরিকতায় আমরা ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলাম। সেখানে গাছের মিষ্টি ডাব খেতে খেতে স্থানীয়দের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলাম। এরপর আমরা গেলাম চাকমা বাজারে, যার স্থানীয় নাম ‘ধনপাতা নতুন বাজার’। সেখান থেকে কিছু কেনাকাটা করে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম রিসোর্টে।
উদ্দেশ্য যেহেতু ছিল রিলাক্স করা, তাই সেদিনের সূর্যাস্তটা উপভোগ করলাম পাহাড়ের কাছে বসে পা দুলিয়ে। কটেজের বারান্দা ঘেঁষে লেক, অন্যপাশে পাহাড়। শরীর এলিয়ে দিয়ে দেখলাম, একটি বক গুটি গুটি পায়ে মাছ শিকারে ব্যস্ত। চোখ বন্ধ করতেই বাতাসে পাতার মড়মড় শব্দ আর পাখির ডাক ছাড়া কিছুই কানে এলো না। তখনই মাথায় তাড়া করল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- ‘অনেক দিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ!’ সত্যিই, এমন পাহাড় আর লেকের মালিক হতে কার না মন চায়!
রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু, রাজবন বিহার, পেদা টিং টিং, স্থানীয় পাহাড়ি বাজার এসব জায়গাও ঘোরা যায়। আমরা গিয়েছিলাম বনভন্তে স্মৃতি চৈত্য মন্দিরে। তবে এসব স্থানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করা এবং স্থানীয়দের আবেগকে সম্মান করা অবশ্যই জরুরি।
যেভাবে যাবেন কাপ্তাই ও রাঙামাটি
ঢাকা থেকে রাঙামাটি যাওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত উপায় বাস। ঢাকা থেকে রাঙামাটি যাওয়ার সরাসরি এসি/নন-এসি বাস রয়েছে। রাতের বাসে উঠলে সকালে পৌঁছানো যায়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম হয়ে কাপ্তাই রোড দিয়ে সিএনজি বা লোকাল বাসে কাপ্তাই নতুন বাজার পৌঁছানো যায়। আবার রাঙামাটি শহর থেকে কাপ্তাই যেতে সিএনজি, বাস কিংবা রিজার্ভ গাড়ি পাওয়া যায়। সড়কপথ ভালো, সেই সঙ্গে পথের দৃশ্য ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
কাপ্তাইয়ের নীরবতা, পাহাড়ের সখ্যতা আর লেকের শান্ত জল- স্মৃতি হিসেবে মনে গেঁথে থাকার মতো। শহুরে কোলাহলের বাইরে নিজের মতো করে কিছু ভালো লাগার মুহূর্ত উপহার দিতে পারে কাপ্তাই লেক আর রাঙমাটির অসামান্য
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
সময়ের আলো/জেডি