কঙ্গোতে ইবোলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০১, স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী
মধ্য আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০১ জনে পৌঁছেছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইতুরি প্রদেশে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কারণে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, সোমবার (৮ জুন) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৫ জনের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ নিয়ে দেশটিতে মোট নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫০ জনে এবং মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০১।
গত ১৫ মে কঙ্গো সরকার বুন্দিবুগিও প্রজাতির ইবোলার প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেয়। তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পরে জানান, ভাইরাসটি কয়েক সপ্তাহ ধরে অজান্তেই ছড়িয়ে পড়ছিল। ফলে শুরুতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে দীর্ঘদিনের সংঘাতকবলিত তিনটি প্রদেশ— ইতুরি, নর্থ কিভু ও সাউথ কিভুতে।
সরকারি তথ্যমতে, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ইতুরির ১৭টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে, নর্থ কিভুর ৭টি এবং সাউথ কিভুর একটি স্বাস্থ্য অঞ্চলে রোগী শনাক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতুরি প্রদেশের ডিজুগু, ইরুমু ও মামবাসা এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসাকর্মীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বহু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার পরিস্থিতি বর্তমানে তুলনামূলক শান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এই তিন প্রদেশে ১২০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। জাতিগত উত্তেজনা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুর্নীতি এবং মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতের কারণে এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস ও প্রতিরোধও ইবোলা মোকাবিলার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
রোববার বুনিয়ার নিয়ামুরঙ্গো কবরস্থানে একটি দাফনকারী দলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দুই ব্যক্তি গুরুতর আহত হন এবং দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশ কঙ্গোতে এটি ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। ১৯৭৬ সালে প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর দেশটি একাধিকবার এমন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই প্রাদুর্ভাবকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে। সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সতর্ক করে বলেন, খনিশিল্পনির্ভর এ অঞ্চলে মানুষের চলাচল অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ভাইরাসটি অন্য অঞ্চল ও দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বান্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা প্রথম শনাক্ত হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে উগান্ডার পশ্চিমাঞ্চলে। এটি এই ভাইরাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাত্র তৃতীয় পরিচিত প্রাদুর্ভাব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বর্তমানে এই প্রজাতির ইবোলার বিরুদ্ধে অনুমোদিত কোনো টিকা বা চিকিৎসা নেই। সম্ভাব্য দুটি টিকা নিয়ে গবেষণা চললেও সেগুলো এখনো মানবদেহে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত নয়।
প্রতিবেশী উগান্ডায় এ পর্যন্ত ১৯ জন আক্রান্ত এবং ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের অধিকাংশই কঙ্গোর নাগরিক, যারা সীমান্ত অতিক্রম করে উগান্ডায় প্রবেশ করেছিলেন।
পরিস্থিতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত কঙ্গো, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদান থেকে আগত যাত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এছাড়া মরিশাসও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে উগান্ডা কঙ্গোর সঙ্গে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে উগান্ডা সফরকালে ডব্লিউএইচও প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সবার জন্য একযোগে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর সমাধান নয়। আমি আশা করি তারা তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।
/ইউএমএইচ