ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ের গাজীপুর থেকে মদনপুর পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার অংশ উন্মুক্ত করা হলেও তার সুফল মিলছে না। মাত্রাতিরিক্ত টোল এবং র্যাম্প ও ইউটার্ন না থাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ চালকই এই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করছেন না। ফলে এক্সপ্রেসওয়ে ফাঁকা থাকলেও নিচের সাধারণ লেনে আগের মতোই তীব্র যানজট ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, পর্যাপ্ত আন্ডারপাস না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা নেট কেটে ও ডিভাইডার টপকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। এতে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর সড়ক নিয়ে গঠিত এই এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ ২০২২ সালের মার্চে শুরু হয়, যার পুরো কাজ চলতি বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ, শামীম এন্টারপ্রাইজ ও ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের যৌথ বিনিয়োগে প্রকল্পটির গাজীপুর অংশের ১৮ কিলোমিটার গত বছরের ২৪ আগস্ট যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গগামী পণ্যবাহী যানবাহন যেন ঢাকা শহরে না ঢুকে দ্রুত যাতায়াত করতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হলেও এখন পর্যন্ত তা লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
চালকদের অভিযোগ, এই এক্সপ্রেসওয়েতে টোলের হার অনেক বেশি। ট্রেলার চালক সাদেকুল ইসলাম জানান, ১৮ কিলোমিটার পথের জন্য এক্সপ্রেসওয়ের টোল ৭৪০ টাকা এবং কাঞ্চন সেতুর টোল ৩২৫ টাকাসহ মোট ১ হাজার ৬৫ টাকা দিতে হচ্ছে।
আবার ট্রাকের জন্য কাঞ্চন সেতুতে ১৩০ টাকা এবং এক্সপ্রেসওয়েতে 6১০ টাকাসহ মোট ৭৪০ টাকা টোল দিতে হয়। পণ্য আমদানিকারকরা এই অতিরিক্ত ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় চালকরা বাধ্য হয়ে যানজটের মধ্যেই নিচের সাধারণ লেন ব্যবহার করছেন।
কাভার্ড ভ্যান চালক জাহিদুল ইসলাম জানান, এক্সপ্রেসওয়ের ১৩ কিলোমিটার অংশই গাজীপুর শিল্প এলাকায় পড়েছে। নরসিংদী, সিলেট ও কালীগঞ্জের মীরেরবাজার হয়ে শত শত গাড়ি উত্তরবঙ্গে যাতায়াত করে। কিন্তু মীরেরবাজারে কোনো র্যাম্প না থাকায় এসব গাড়ি এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে পারছে না। এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে হলে তাদের প্রায় ১০ থেকে ১৮ কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে।
ফলে অতিরিক্ত টোলের পাশাপাশি জ্বালানি ও সময় বেশি নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই ত্রুটির কারণে চমৎকার এই সড়কটি তাদের কোনো কাজে আসছে না। সড়কটি ব্যবহার করতে হলে তাদের ভোগড়া চৌরাস্তা বা কাঞ্চন সেতু ঘুরে আসতে হয়।
এদিকে, এই এক্সপ্রেসওয়েটি স্থানীয় মানুষের জন্য বড় ভোগান্তি ও দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৈরান এলাকার বাসিন্দা মোহর আলী জানান, মাত্র ৬০-৭০ ফিট প্রস্থের এই সড়কটির কারণে রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশের মানুষের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আগে যেখানে যাতায়াতে ৫ মিনিট লাগত, এখন ২ কিলোমিটার ঘুরে আন্ডারপাস দিয়ে যেতে পৌনে ১ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে।
ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ ভোগড়া, জাঝড়, মৈরান ও মেঘডুবিসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে সেফটি নেট বা তারের বেড়া কেটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে।
আরেক বাসিন্দা রুস্তম আলী জানান, স্কুল শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এভাবে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। একটি ফ্লাইওভার বা ওভারপাসের দাবিতে এলাকাবাসী এর আগে একাধিকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভও করেছেন।
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের টোল প্লাজার সহকারী ব্যবস্থাপক মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘এই সড়কে ভারী ও মাঝারি যানবাহন বেশি চলে এবং টোলের হার সরকারই নির্ধারণ করেছে। এখনো এক্সিট পয়েন্টগুলোর কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রায় ৫০ শতাংশ যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ের বাইরে দিয়ে চলছে। পুরো সড়ক চালু হলে এবং ওয়েট স্কেল (ওজন পরিমাপক) চালু হলে অতিরিক্ত লোডের গাড়িগুলো আর বাইরে দিয়ে যেতে পারবে না, তখন এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ির সংখ্যা বাড়বে।’
তিনি আরও জানান, নির্দিষ্ট গতিতে গাড়ি চলার সুবিধার্থেই এক্সপ্রেসওয়েতে যত্রতত্র পারাপার বন্ধ করতে ফেন্সিং বা নেট দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা যেখানে নেট কাটছে, সেখানে কোম্পানির পেট্রোল টিম দিয়ে সেফটি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তবে দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। পুরো এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে সব ধরনের ঝুঁকি কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সময়ের আলো/জেডি