ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় মাদকের বিস্তার এখন চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একসময়ের শান্ত ও নিরাপদ এই জনপদ এখন ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ নানা মরণনেশার অবাধ চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে মাদক কারবারিদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সম্প্রতি বাজারে আসা ক্ষতিকর ‘ট্যাপেন্টাডল’ ট্যাবলেটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। মাদকের এই সহজলভ্যতায় পা বাড়াচ্ছে ১২-১৩ বছরের কিশোরেরাও। আর নেশার চড়া টাকা জোগাতে তরুণরা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও রাহাজানির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় পুরো উপজেলায় সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, কালীগঞ্জ পৌর এলাকাসহ কাশিপুর, চাচড়া, শিবনগর, আড়পাড়া, বলিদাপাড়া, রায়গ্রাম, দুলালবন্দিয়া, ফয়লা, খয়েরতলা, ভাটপাড়া ও আলাইপুরসহ অর্ধশতাধিক স্পটে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি চলছে। এছাড়া বারোবাজারের মঙ্গলপৈতা, সোনালী ডাঙ্গার মোড়, বারফা ব্রিজ ও জাহাজমারির ঘাটসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় মাদক কারবারিরা নিরাপদ আস্তানা গেড়েছে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কয়েকজন জনপ্রতিনিধির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় এই অবৈধ কারবার চলছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকেও মাদকসেবীরা এখানে এসে নিরাপদে নেশা করে চলে যাচ্ছে। ফলে কালীগঞ্জ এখন একটি আঞ্চলিক মাদক ট্রানজিটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মাদকের এই ভয়াবহ থাবায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় অভিভাবকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, গ্রামে মাদকের চাহিদা বেশি অথচ আইনি ভয় কম থাকায় বিক্রেতারা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এদের বিরুদ্ধে কথা বললে উল্টো বিপদে পড়ার ভয় থাকে, যার কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না। স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম রবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে তরুণদের দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, আজ তাদের চোখ নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে আছে। মাদক এখন শুধু দরিদ্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তানদেরও ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে।’
এলাকাবাসীর দাবি, র্যাব, ডিবি পুলিশ কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তা মূলত খুচরা বিক্রেতা বা সেবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে মূল হোতারা সবসময়ই অধরা থেকে যায়। এছাড়া আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে গ্রেফতারকৃতরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই পেশায় লিপ্ত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা আগের চেয়ে কমেছে দাবি করে স্থানীয়রা বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে এলাকাভিত্তিক স্থায়ী চেকপোস্ট ও নিয়মিত টহল জোরদার না করা হলে পুরো একটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে।
ঝিনাইদহ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ মোহাম্মদ হাসেম আলী মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র স্বীকার করে বলেন, ‘বর্তমানে মাদক কারবারির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় থাকবে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জেল্লাল হোসেন বলেন, ‘উপজেলাকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধী যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মাদকচক্রের মূল উপড়ে ফেলতে সাধারণ মানুষের সঠিক তথ্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন।’
সময়ের আলো/জেডি