বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক হলো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট (মূসক) প্রবর্তন। বর্তমানে সরকারের কোষাগারে জমা হওয়া মোট রাজস্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে এই খাত থেকে, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে আজ যে করব্যবস্থাকে আমরা স্বাভাবিক নিয়মে দেখছি, তার সূচনা পর্বটি মোটেও মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিরোধ এবং নানামুখী বিতর্কের মধ্য দিয়ে এই আধুনিক কর কাঠামো রূপ পেয়েছিল।
ভ্যাট কেন অপরিহার্য এবং এর বিশ্বজনীন প্রেক্ষাপট
মূল্য সংযোজন কর একটি পরোক্ষ করব্যবস্থা, যেখানে পণ্য বা সেবা উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে যুক্ত হওয়া বাড়তি মূল্যের ওপর কর ধার্য করা হয়। যদিও বিক্রেতারা এই কর সরকারের কাছে জমা দেন, তবে এর আসল ব্যয়ভার বহন করতে হয় চূড়ান্ত ভোক্তাকে। কর ফাঁকি রোধ এবং সরকারের জন্য একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য রাজস্বের উৎস তৈরিতে ভ্যাট অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানে বাংলাদেশে সাধারণ ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ হলেও খাতভেদে এর কিছু বিশেষ হার (১.৫% থেকে ১০%) প্রচলিত রয়েছে।
বিশ্বে এই কর ধারণার প্রথম জন্ম ১৯২০ সালে জার্মান ব্যবসায়ী ভন সিমেন্সের হাত ধরে। পরে ১৯৫৪ সালে ফ্রান্স বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আধুনিক ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করে। বর্তমানে পৃথিবীর ১৭৫টিরও বেশি দেশে এই কর নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
যে কারণে বাংলাদেশে ভ্যাটের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত আমদানি শুল্ক এবং প্রচলিত বিক্রয় করের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে আশির দশকে দেশের অর্থনীতির পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পুরোনো কর কাঠামো দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার পর দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের রাজস্ব খাতে আমূল সংস্কারের তাগিদ দেয়।
আইএমএফের সম্পৃক্ততা
১৯৮৯ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. ওয়াহিদুল হকের আমন্ত্রণে আইএমএফের একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে আসে। এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর, যিনি তখন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টে কর্মরত ছিলেন। এই প্রতিনিধি দলের মূল কাজ ছিল বাংলাদেশে ভ্যাট চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করা। তারা ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো দেশগুলোর ভ্যাট ব্যবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছে জমা দেন।
ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ ও তীব্র বিরোধিতা
ভ্যাট চালুর ঘোষণা আসার পর দেশজুড়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। হিসাব ও লেনদেন প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ করার বাধ্যবাধকতাকে অনেকেই প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে দেখেন। ড. আহসান এইচ মনসুরের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, সে সময় হাজার হাজার ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী এনবিআর ভবন ঘেরাও করে ‘ভ্যাট চলবে না’ স্লোগান দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, এই করের ফলে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে। তবে তীব্র বিরোধিতার মুখেও সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যায়নি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অধ্যাদেশের জটিলতা
১৯৯০ সালে ভ্যাট আইনের খসড়া যখন চূড়ান্ত, ঠিক তখনই দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। যেহেতু তখন কোনো নির্বাচিত সংসদ ছিল না, তাই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই আইন কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়। শুরুতে অস্থায়ী সরকারের প্রধান হিসেবে এত বড় দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ দ্বিধাবোধ করলেও, বাজেটের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মতি দেন।
আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ
অবশেষে ১৯৯১ সালের ৩১ মে মূল্য সংযোজন কর অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং তা ১ জুলাই থেকে আংশিকভাবে কার্যকর হয়। এরপর নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘মূল্য সংযোজন কর বিল’ পাস করিয়ে নেন। পরদিনই রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়।
অগ্রগতি ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
শুরুতে অল্প কিছু পণ্যের ওপর ভ্যাট ধার্য করা হলেও বর্তমানে উৎপাদন, আমদানি, পাইকারি-খুচরা ব্যবসা এবং সেবা খাতসহ অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভ্যাট বিস্তৃত হয়েছে। তবে সাড়ে তিন দশক পার করার পরও এই খাত নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়ে গেছে। ভোক্তা অধিকারকর্মী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক ব্যবসায়ী ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেন না। সব দোকানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বা ডিজিটাল রসিদ ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় এখনও কর ফাঁকির সুযোগ রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
সব চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা একমত যে, ১৯৯১ সালের এই কর সংস্কার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর ফলে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, মহাসড়ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝড় মোকাবিলা করে শুরু হওয়া এই ভ্যাট ব্যবস্থা আজ বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনীতির মূল স্তম্ভে পরিণত হচ্ছে।
সময়ের আলো/জেডি