সিলেট অঞ্চলের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের চাকা চরম স্থবিরতার মুখে পড়তে যাচ্ছে। জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি উপজেলায় এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলীর পদ শূন্য কিংবা শূন্য হওয়ার অপেক্ষায়। প্রকৌশলীদের এই তীব্র সংকটের কারণে একদিকে যেমন থমকে গেছে নিয়মিত উন্নয়ন প্রকল্প, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় ও বিগত ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণের কাজও ধীরগতিতে চলছে। ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সিলেটবাসী।
এলজিইডি সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে বর্তমানে বিশ্বনাথ, ফেঞ্চুগঞ্জ এবং জকিগঞ্জ- এই তিন উপজেলায় কোনো নিয়মিত উপজেলা প্রকৌশলী নেই, পদগুলো পুরোপুরি শূন্য। এর বাইরে কানাইঘাট ও ওসমানীনগর উপজেলার কর্মকর্তাদের সম্প্রতি বদলির আদেশ হয়েছে। অন্যদিকে, সিলেট সদর ও জৈন্তাপুর উপজেলার কর্মকর্তারা পদোন্নতি পাওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে একসঙ্গে ৭টি উপজেলায় প্রকৌশলী সংকট বা শূন্যতা তৈরি হওয়ায় গ্রামীণ সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
সিলেটবাসীর জন্য এই সংকট আরও বড় দুর্যোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিগত বছরগুলোর ক্ষয়ক্ষতির কারণে। ২০২২ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় লন্ডভন্ড হওয়া গ্রামীণ সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট সংস্কারের বড় একটি অংশ এখনো চলমান। এর আগে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজও চলছে মাঠপর্যায়ে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে কাজের তদারকি করার মতো মূল কর্মকর্তা (উপজেলা প্রকৌশলী) না থাকায় ঠিকাদাররা কাজে ধীরগতি দেখাচ্ছেন। কোনো কোনো এলাকায় কাজ আংশিক বন্ধ রয়েছে। প্রকৌশলীর অনুপস্থিতিতে কাজের গুণগত মান রক্ষা করা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে যেসব উপজেলার পদ শূন্য রয়েছে, সেখানে পার্শ্ববর্তী উপজেলার প্রকৌশলীদের ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, একজন কর্মকর্তার পক্ষে নিজের উপজেলার বিশাল কাজের পরিধি সামলে অন্য আরেকটি উপজেলার ফাইলপত্র সই করা, ডিজাইন তৈরি করা এবং সাইট ভিজিট করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে ফাইল টেবিলেই আটকে থাকছে দিনের পর দিন, ব্যাহত হচ্ছে এডিপি ও অন্যান্য বিশেষ প্রকল্পের কাজ।
সার্বিক এই সংকট ও গ্রামীণ অবকাঠামো কাজের ধীরগতির বিষয়ে কথা বলেছেন এলজিইডি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খান। তিনি পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বেশ কয়েকটি উপজেলায় কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকা এবং কয়েকজনের বদলি ও পদোন্নতিজনিত কারণে কাজের গতিতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে এটি সত্য। বিশেষ করে ২০২২ সালের বন্যা এবং সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামোগুলোর পুনর্বাসন কাজ আমরা দ্রুততম সময়ে শেষ করতে চাচ্ছি, কিন্তু জনবল সংকট সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, আমরা বিকল্প উপায়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছি যাতে জনভোগান্তি না হয়। তবে স্থায়ী সমাধান জরুরি। সিলেটের গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নকাজের এই ধীরগতি কাটিয়ে উঠতে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো দ্রুত শেষ করতে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নতুন কর্মকর্তা পদায়নের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। আশা করছি দ্রুতই এই সংকটের সমাধান হবে।
সিলেটের সচেতন নাগরিক ও সাধারণ মানুষের দাবি, গ্রামীণ যোগাযোগ সচল রাখতে এবং চলমান পুনর্বাসন প্রকল্পগুলো বর্ষা মৌসুমের আগেই শেষ করতে জরুরি ভিত্তিতে সিলেটে দক্ষ উপজেলা প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া হোক।
সময়ের আলো/জোই