বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর গল্প সবসময় এক রকম হয় না। কোনো দল আসে শক্তিশালী লিগ, আধুনিক অবকাঠামো আর বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য নিয়ে। আবার কোনো দলকে পৌঁছাতে হয় অনেক বাধা পেরিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া হাইতি সেই দ্বিতীয় দলের অন্যতম উদাহরণ।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট দেশ হাইতি, বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং গ্যাং সহিংসতায় জর্জরিত। রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্সের অনেক এলাকায় সরকারের চেয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ বেশি বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে কার্যক্রম চালাতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
এই বাস্তবতার প্রভাব পড়েছে দেশটির ফুটবলেও। জাতীয় দলকে প্রায় নিজেদের দেশে প্রস্তুতি ক্যাম্প বা আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ ছাড়াই এগিয়ে যেতে হয়েছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ সময়েও প্রস্তুতি অন্য দেশে সম্পন্ন করতে হয়েছে। ফলে ঘরের মাঠের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়েই এগিয়ে গেছে দলটি। নিরাপত্তা সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অনুমোদনও পায়নি হাইতি। তাই ডোমিনিকান রিপাবলিক, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশে অনুশীলন ও প্রস্তুতি সারতে হয়েছে। যে সুযোগ অন্য দেশগুলো সহজেই পায়, সেটির জন্যও সংগ্রাম করতে হয়েছে হাইতির ফুটবলারদের।
তবে ফুটবলের সঙ্গে হাইতির সম্পর্ক নতুন নয়। ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে খেলেছিল দেশটি। সে আসরে ইতালি, আর্জেন্টিনা ও পোল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বারবার পিছিয়ে পড়েছে দেশটির ফুটবল। তবু ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রতিভাবান ফুটবল জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় হারায়নি।
এবারের বিশ্বকাপে হাইতির বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের স্কোয়াড। দলের একটা বড় অংশই প্রবাসী ফুটবলার। কেউ ফ্রান্সে, কেউ যুক্তরাষ্ট্রে, আবার কেউ কানাডা বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে বেড়ে উঠেছেন। বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ফুটবল দর্শনের মধ্যে বেড়ে ওঠা এসব খেলোয়াড়দের একত্র করে দল তৈরি করা সহজ কাজ ছিল না। আর সেই কঠিন কাজটিই করেছেন কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে।
ফরাসি এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শৃঙ্খলা, কৌশলগত সংগঠন ও দলীয় ঐক্যের ওপর জোর দেন। ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলারদের একত্র করে, জাতীয় দলের প্রতি দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। হাইতিতে অভ্যন্তরীণ গ্যাং সহিংসতার কারণে নিজেদের মাঠে কোনো ম্যাচ খেলতে না পারলেও কোচ মিগনে দলটিকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রেখেছেন। তার স্পষ্ট লক্ষ্য হলো গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে হাইতিকে নকআউট রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া। সেবাস্তিয়েন মিগনের খেলোয়াড়ি জীবন কোচিং ক্যারিয়ারের মতো অতটা জমকালো বা বিশ্বখ্যাত ছিল না। একজন ফুটবলার হিসেবে তিনি মূলত সাধারণ মানের বা মাঝারি স্তরের লিগে খেলেছেন।
অনেক ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, হাইতির বিশ্বকাপ যাত্রার সবচেয়ে বড় স্থপতি মিগনেই। তার অধীনেই হাইতি দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরার স্বপ্ন পূরণ করেছে। ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে খেলতে যাচ্ছে দেশটি। এটি শুধু একটি ক্রীড়া অর্জন নয়, বরং একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক।
তবে কোচের পাশাপাশি নেতৃত্বের বড় দায়িত্ব পালন করেছেন অধিনায়ক জনি প্লাসিদ। অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক শুধু পোস্টের নিচে ভরসার নামই নন, ড্রেসিংরুমেরও অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা প্লাসিদ কঠিন সময়গুলোতে সতীর্থদের একত্র রেখেছেন। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে যোগাযোগ ও ঐক্য ধরে রাখতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে যেমন তিনি শেষ প্রহরী, তেমনি মাঠের বাইরেও তিনি দলের মানসিক শক্তির প্রতীক।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে হাইতি গ্রুপ ‘সি’-তে ব্রাজিল, মরক্কো আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে লড়বে। বিশ্বকাপে হাইতিকে হয়তো ফেবারিট হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কিন্তু ফুটবল সবসময় ট্রফির গল্প নয়। কখনো কখনো এটি সংগ্রাম, আশা এবং বেঁচে থাকার গল্পও।
দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সংকট আর সহিংসতার মাঝেও যে স্বপ্ন দেখা যায়, হাইতির বিশ্বকাপ যাত্রা সেটিই প্রমাণ করেছে। নিজেদের দেশে অনুশীলনের সুযোগ না পেয়েও সীমিত সম্পদ নিয়েও এবং প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও দলটি বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে। আর সেই স্বপ্নের নেতৃত্বে আছেন কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে, সঙ্গে আছেন অধিনায়ক জনি প্লাসিদের মতো অভিজ্ঞ যোদ্ধারা। যাদের হাত ধরেই নতুন ইতিহাস লিখেছে ক্যারিবীয় দেশটি।
হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা শিরোপার দাবিদার নয়। কিন্তু হাইতির গল্প ইতিমধ্যেই কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। কারণ এই গল্প শুধু ফুটবলের নয়, এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই এবং হার না মানা এক জাতির গল্প।
সময়ের আলো/আআ