একসময় নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ত্রিশাল পৌর চকবাজার এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল মহিলা বিপণি বিতান। নামমাত্র মাসিক ভাড়ায় নারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া এসব দোকান সময়ের ব্যবধানে নারী উদ্যোক্তার অভাবে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকারি কোষাগারে মাসিক মাত্র ৩০০ টাকা জমা হলেও দোকান ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে নেওয়া হতো আড়াই হাজার টাকা করে।
অভিযোগ উঠেছে, ৫ আগস্টের পরও এ অনিয়ম-দুর্নীতি অব্যাহত ছিল। এই বিপণি বিতানের আওতায় প্রথম দিকে ছয়টি ও পরবর্তীতে দুটি দোকানসহ মোট আটটি দোকান। এখানে কেউ চা স্টল, কেউ কাঁচামালের দোকান, আবার কেউ ছোট ওষুধের দোকান করতেন। ৫ আগস্টের আগে এ দোকানগুলোর ভাড়া তুলে নিতেন কাউন্সিলরা। পরবর্তীতে ৫ আগস্টের পর ৮ টি দোকান থেকে ৬ মাস ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া তোলেন বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম ও পরবর্তীতে পৌর প্রধান সহকারী এছাহাক আলী ভাড়া আদায় করেন। এ ভাড়ার টাকা প্রতি দোকান হিসেবে পৌর সভায় জমা হয়েছে তিনশ টাকা করে। বাকী টাকা গেল কোথায় জানে না কেউ।
লোটে পুটে খাওয়ার পর এ দোকানগুলো সদ্য আসা পৌর প্রশাসক আরাফাত সিদ্দিকি ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা নওশিন আহমেদ এক যুগের বেশী দিন ধরে থাকা দোকানীদের দোকান খালি করতে একাধিকবার পাঠান নোটিশ। দোকান না ছাড়তে চাইলে সম্প্রতি অল্প সময়ের নোটিশে দোকান খালি না করলে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয় পৌর প্রশাসন। এ সময় পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে ফিরে যেতে হয়। পরে আরেকদিন নিয়মের ভেতর পুরাতন ব্যবসায়ীদের দোকান দেওয়ার আশ্বাসে দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেয় প্রশাসন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, আশেপাশের বাজারদরের তুলনায় অতিরিক্ত টাকা আদায়ের শর্ত দিয়ে পরপর তিনবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পেয়ে পরে নিজেদের পছন্দমতো ব্যক্তিদের সক্ষমতার ভিত্তিতে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, পৌর প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে আবারও সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছেন। ৮ টি দোকানের মধ্যে দরপত্র অনুযায়ী দুটি দোকান অফেরতযোগ্য শর্তে ৬ লাখ টাকা ও ১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। বাকী দোকানগুলো সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতি দোকান ৩ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে দিয়েছেন দোকানিরা। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পাঁচটি দোকানের জন্য এক লাখ টাকা করে এবং একটি দোকানের জন্য দেড় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে দোকানপ্রতি আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
দোকান না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাবেক যুবদল নেতা হুমায়ুন কবির লেখেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ত্রিশালে আপনি আগমন করার পূর্বে ১৭ বছরের আন্দোলন, মামলা, হামলা, জেল-জুলুমের পুরস্কার হিসেবে আপনার প্রশাসন, আপনার নেতারা আমার পেটে লাথি দিল। জানি বিচার পাব না, কিন্তু বিএনপি করি এই কষ্টে লিখলাম।
দোকান বঞ্চিত গোলাম মোস্তফা, ছফির উদ্দিন, ওয়াদুদ বলেন, আমরা ২০ বছরের অধিকসময় ধরে ব্যাবসা করে আসছি। নিয়মিত পৌরসভাকে দোকান ভাড়া দিয়েছি। তারা ভাড়ার কোনো রিসিট কোনোদিন আমাদের দেয় নাই। হঠাৎ আমাদের পেটে লাথি দিয়ে উচ্ছেদ করেছে। এভাবে দোকান বরাদ্দ দেবে জানলে টাকা দিয়ে আমরাই দোকান নিতাম।
পৌর বাজার পরির্দশক রাজিবুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর ছয়মাসের ভাড়া ২৫০০ টাকা করে আমি তুলে এনে জমা দিয়েছে। এতে পৌরসভা কত টাকা পাবে, বাকী টাকা কি হয়েছে আমি জানি না। এখন আমাকে সরিয়ে পৌর প্রধান সহকারী এছাহাক আলী ভাড়ার টাকা তোলেন।
এ বিষয়ে পৌর প্রধান সহকারী এছাহাক আলী বলেন, আমি ভাড়ার টাকা তুলেছি, এখনো জমা দেইনি। তবে দ্রুতই জমা দেবো। আমি ভাড়া তোলার আগে পৌরসভায় দোকান প্রতি ৩ শ টাকা জমা হতো।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা নওশিন আহমেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কথাটি এড়িয়ে গিয়ে পৌর প্রকৌশলী ও পৌর প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
এ বিষয়ে সদ্য বিদায়ি পৌর প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার দেবনাথ বলেন, দোকান প্রতি পৌরসভায় ৩০০ টাকা জমা হতো। বাকী টাকা কারা নিত না নিত সবাই জানে। দোকান কীভাবে কি বরাদ্দ হয়েছে জানি না বললে ভুল হবে। তবে বিষয়টা এরকমই। আমার বিদায়ের শেষ কার্যদিবসে আমি ফাইলটি স্বাক্ষর করেছি। এ দোকানগুলোর যারা ভাড়া তুলে পৌরসভারে ৩০০ টাকাও জমা দেয় না বাকিটা যার যার পকেটে ভরে।
এ বিষয়ে বর্তমান পৌর প্রকৌশলী লুৎফুল ইসলাম বলেন, ওইখানের আটটি দোকানের মধ্যে দুইটি আগেই দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি ছয়টি তিনবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও সাড়া না পাওয়ায় সক্ষমতার ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি এক লাখ টাকা করে এবং একটি দেড় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নিয়ে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, দীর্ঘদিন পৌরসভা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমি অনেক চেষ্টার পর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করেছি। আগে কী হয়েছি আমি জানি না। দরপত্র ও সক্ষমতার মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। টাকা ব্যাংকে জমা আছে। দোকানিরা অতিরিক্ত টাকা কে, কাকে দিয়েছে বলতে পারবো না।
সময়ের আলো/জোই