ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বিশ্বজুড়ে চলছে উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে ৩৯ দিনব্যাপী এই বৈশ্বিক ফুটবল উৎসবের আয়োজন করছে। দর্শকদের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ করতে এবং ম্যাচ পরিচালনায় অধিক নির্ভুলতা আনতে বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি রেফারিং ব্যবস্থাতেও আনা হয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এক নজরে দেখে নিন নতুন প্রযুক্তি ও নিয়মগুলো।
সেন্সরযুক্ত ‘ট্রিওন্ডা’ ম্যাচ বল : এবারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বলের নাম রাখা হয়েছে ‘ট্রিওন্ডা’। স্প্যানিশ ভাষায় এর অর্থ ‘তিনটি ঢেউ’। অ্যাডিডাস কোম্পানির তৈরি এই বলের ভেতরে ছোট ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ) সেন্সর চিপ বসানো হয়েছে। এই সেন্সর বলের নড়াচড়া ট্র্যাক করতে পারে এবং প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য সংগ্রহ করে। বলের গতি এবং ত্রিমাত্রিক মুভমেন্টের বিস্তারিত তথ্য সেন্সরের মাধ্যমে পাওয়া যায়।
ফিফা জানিয়েছে, এই প্রযুক্তি সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিস্টেমে রিয়েল টাইমে তথ্য পাঠাবে। এর ফলে অফসাইডের মতো সিদ্ধান্তগুলো আরও দ্রুত এবং নিখুঁত হবে।
এআই-চালিত থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার : প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু বলেই সীমাবদ্ধ নেই, খেলোয়াড়রাও এর অংশ হয়েছেন। ফিফা এবং বিশ্বের অন্যতম বড় কম্পিউটার প্রস্তুতকারক কোম্পানি লেনোভো যৌথভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর থ্রিডি প্লেয়ার সামনে এনেছে।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ডিজিটাল স্ক্যান করে থ্রিডি মডেল তৈরি করা হবে। ফিফার মতে, এই প্রযুক্তি খেলোয়াড়দের শরীরের মাপ নিখুঁতভাবে সংগ্রহ করতে পারে। ফলে খেলোয়াড়রা যখন দ্রুত দৌড়ান বা অন্য খেলোয়াড়দের আড়ালে থাকেন, তখনও সিস্টেম তাদের ট্র্যাক করতে পারবে।
গত জানুয়ারিতে ফিফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, এই এআই-চালিত থ্রিডি অবতারগুলো সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি। এই থ্রিডি মডেলগুলো সরাসরি টিভিতে সম্প্রচার করা হবে। এর ফলে ভিএআর সিস্টেমের মাধ্যমে নেয়া অফসাইডের সিদ্ধান্তগুলো স্টেডিয়াম এবং টিভির দর্শকদের কাছে আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা যাবে। এছাড়া ১০৪ ম্যাচেই রেফারির শরীরে বডি ক্যামেরা লাগানো থাকবে। দর্শকরা রেফারির দৃষ্টিকোণ থেকে মাঠের খেলা উপভোগ করতে পারবেন।
রোবট কুকুর বা রোবটিক ডগ : মেক্সিকোর পুলিশ বিশ্বকাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবন্ত কুকুরের বদলে রোবট কুকুর ব্যবহার করবে। চারপেয়ে এই রোবটগুলো বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ করে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে লাইভ ভিডিও পাঠাবে। এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনী কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পরিস্থিতির পরিষ্কার ধারণা পাবে।
মেক্সিকোর মন্টেরি মেট্রো এলাকার অংশ গুয়াদালুপের সিটি কাউন্সিল এক লাখ ৪৫ হাজার ডলার খরচ করে এই রোবটগুলো কিনেছে। গুয়াদালুপের মেয়র হেক্টর গার্সিয়া জানিয়েছেন, যেকোনো ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এগুলো ব্যবহার করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাথমিক হস্তক্ষেপে সাহায্য করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই রোবট কুকুরগুলোর উদ্দেশ্য।
উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি : লাইনম্যানরা দেরিতে অফসাইডের পতাকা তুললে প্রায়ই ঝামেলা তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধানে ফিফা এবার উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে। আগের সংস্করণে কোনো খেলোয়াড় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকলে রেফারিকে সতর্ক করা হতো। নতুন সংস্করণে কোনো খেলোয়াড় ১০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকলেই সিস্টেম তা ধরে ফেলতে পারবে।
রেফারিরা ভিএআরের যোগাযোগের জন্য অপেক্ষা না করেই সরাসরি তাদের ইয়ারপিসে অডিও সংকেত পাবেন। তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি শুধু পজিশনাল অফসাইড ধরতে পারবে, সাবজেক্টিভ বা ব্যাখ্যামূলক অফসাইডের ক্ষেত্রে কাজ করবে না। এছাড়া খুব কাছাকাছি থাকা অফসাইড ধরতে এটি সক্ষম নয়। খেলোয়াড় মাটিতে পড়ে থাকলে বা একসঙ্গে অনেকে জড়ো হয়ে থাকলে সিস্টেম বিভ্রান্ত হতে পারে। তারপরও ফিফা মনে করে, এই প্রযুক্তির কারণে অফসাইড নিয়ে দর্শকদের হতাশা অনেক কমে যাবে।
বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি : খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে ফিফা এবার খেলার দুই ভাগে (১ম অর্ধ ও ২য় অর্ধ) তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি বাধ্যতামূলক করেছে। আবহাওয়া বা তাপমাত্রা যেমনই হোক না কেন, দুই অর্ধের ২২ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে এই বিরতি দেওয়া হবে।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ইউএসএ অঞ্চলের চিফ টুর্নামেন্ট অফিসার মানোলো জুবিরিয়া জানিয়েছেন, খেলা যেখানেই হোক, ছাদ থাকুক বা না থাকুক, তিন মিনিটের বিরতি অবশ্যই থাকবে।
ভিএআর প্রটোকলে নতুন সংযোজন : ভিএআর নিয়ে দর্শকদের অসন্তোষ থাকলেও ফিফা এর ব্যবহার আরও বাড়াচ্ছে। এখন থেকে কর্নার থেকে হওয়া যে কোনো সিদ্ধান্ত ভিএআর দিয়ে চেক করা হবে। আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) জানিয়েছে, ভিএআর খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই কেবল হস্তক্ষেপ করবে। তবে এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড বা লাল কার্ডের ক্ষেত্রেও ভিএআর চেক করা হবে। বর্তমানে ভিএআর শুধু সরাসরি লাল কার্ডের ক্ষেত্রে কাজ করে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আইএফএবি ভিএআর প্রটোকলে আরেকটি পরিবর্তন এনেছে। সেট পিস বা ফ্রি-কিক নেয়ার আগে কোনো ফাউল হয়েছে কি না, তা যাচাই করার ক্ষমতা ভিএআরকে দেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বক্সের ভেতরে ধাক্কাধাক্কি বা ফাউল কমানো।
মুখ ঢাকা এবং মাঠ ছাড়ার কারণে লাল কার্ড : এই বছর দুটি আলোচিত ঘটনার পর লাল কার্ডের নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস ফাইনালে সেনেগালের কোচ এবং কিছু খেলোয়াড় রেফারির পেনাল্টির প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে চলে যান। এখন থেকে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কোনো খেলোয়াড় বা কর্মকর্তা মাঠ ছাড়লে তাকে লাল কার্ড দেখানো হবে।
একইভাবে কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কোনো খেলোয়াড় যদি মুখ ঢেকে কথা বলেন, তবে তাকেও লাল কার্ড দেওয়া হবে।
‘ট্যাকটিক্যাল টাইমআউট’ বন্ধের উদ্যোগ : খেলার মাঝে কৌশলগত বিরতি বা ‘ট্যাকটিক্যাল টাইমআউট’ নিয়ে ফুটবলে হতাশা বাড়ছে। খেলোয়াড়ের আঘাতের চিকিৎসার সময় কোচরা প্রায়ই অন্যান্য খেলোয়াড়দের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ খোঁজেন। ফিফা এই ধরনের সুযোগ বন্ধ করতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। মাঠের খেলোয়াড়দের চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হবে এবং চিকিৎসা শেষে মাঠে ফেরার আগে ৬০ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হবে। গোলরক্ষকদের মাঠেই চিকিৎসা দেওয়া হবে। তবে ওই সময় অন্যান্য খেলোয়াড়দের সেন্টার সার্কেলে চলে যেতে হবে। তারা কোচের টেকনিক্যাল এরিয়ায় যেতে পারবেন না।
গোল-কিকের সময় নষ্ট করা রোধে রেফারির কাউন্টডাউন বা গণনা পদ্ধতি সফল হওয়ায় এবার থ্রো-ইনের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম চালু হচ্ছে। খেলোয়াড় থ্রো-ইন বা গোল-কিক নিতে দেরি করলে রেফারি পাঁচ সেকেন্ডের কাউন্টডাউন শুরু করতে পারেন। গণনা শূন্যে পৌঁছালে থ্রো-ইন বা গোল-কিক প্রতিপক্ষকে দিয়ে দেওয়া হবে।
এছাড়া বদলি হিসেবে মাঠ ছাড়ার সময় কোনো খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হবে। এর বেশি সময় নিলে বদলি খেলোয়াড়কে মাঠে নামার জন্য আরও এক মিনিট অপেক্ষা করতে হবে।
সময়ের আলো/আআ