নওগাঁর হাটগুলোতে ইজারাদার ও ব্যাপারীদের (ব্যবসায়ীদের) জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। ধলতার নামে সবজি ও আমের ওজনে মণপ্রতি অতিরিক্ত দুই থেকে আট কেজি পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। নিয়ম বহির্ভূতভাবে জোরপূর্বক কৃষকের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে খাজনা। নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফজলে হুদা বাবুলের নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে সারা দেশে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ওজনে অনিয়ম বন্ধে পরিপত্র জারি করা হয়েছে। পরিপত্রে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ধলতা বা শুকনা কোনো অজুহাতেই প্রতি মণে চল্লিশ কেজির বেশি নেওয়া যাবে না। তবে সেই পরিপত্র কাগজেই রয়ে গেছে। পরিপত্রের নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এমন কি সরকারি তত্ত্বাবধানে খাস আদায়ের হাটেও মানা হচ্ছে না সরকারি নিয়ম।
কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ওজনে অনিয়ম বন্ধের লক্ষ্যে মণপ্রতি চল্লিশ কেজির বেশি নেওয়া যাবে না মর্মে পরিপত্র জারি করা হয়েছে কিছুদিন আগে। তবে সেই পরিপত্র কাগজেই রয়ে গেছে। প্রশাসনের নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। এ কারণে হরহামেশাই কৃষকদের সঙ্গে ব্যাপারী ও হাট ইজারাদারদের মধ্যে চলছে হট্টগোল। কৃষকরা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে অবিলম্বে সবজি ও আমের হাটের এসব অনিয়ম বন্ধের দাবি জানান।
এ প্রসঙ্গে নওগাঁ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিপত্র জারির পর থেকে আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। তবে কোনো কৃষকের কাছ থেকে আমরা অভিযোগ পাইনি। কৃষকরা সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
আরও পড়ুন
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই সরকারের কাছ থেকে একটি পরিপত্র পেয়েছি। তাতে নির্দেশ আছে কৃষকদের কাছ থেকে ধলতা বা শুকনার নামে কোনোভাবেই মণপ্রতি ৪০ কেজির বেশি নেওয়া যাবে না। বদলগাছী একটি সবজি ভাণ্ডার এবং এখানে জিআই সনদপ্রাপ্ত নাকফজলি আম রয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা বাজার মনিটরিং শুরু করেছি। আমাদের এই মনিটরিং অব্যাহত থাকবে। কখনো কোনো ভুক্তভোগী কৃষকের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকার নির্ধারিত মূল্যেই খাজনা আদায় করা হয়। তারপরও কোনো ভুক্তভোগী কৃষক মৌখিক অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিন জিআই সনদপ্রাপ্ত নাকফজলি (নাকের মতো দেখতে) আমের জন্য বিখ্যাত এবং সবজিভান্ডার হিসেবে সুপরিচিত বদলগাছী হাটে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষকরা কষ্টে উৎপাদিত সবজি নিয়ে হাটে ঢুকলেই প্রথমে তোলার নামে (হাট ঝাড়ুদারকে) দিতে হয় মণপ্রতি এক কেজি। দরদাম শেষে সবজি বিক্রির পর ধলতার নামে ব্যাপারীদের (ব্যবসায়ীদের) দিতে হয় মণপ্রতি দুই থেকে তিন কেজি বেশি। ৪০ কেজিতে মণ হলেও এখানে ৪২-৪৩ কেজিতে মণ হিসাব করা হয়। শুধু এখানেই শেষ নয়, নিয়ম না থাকলেও খাজনা হিসেবে কৃষকের কাছ থেকে জোর করে কেটে নেওয়া হয় প্রতি মণ পটোল ও আলুর জন্য ২০ টাকা, প্রতি মণ মরিচ ও অন্যান্য সবজির জন্য ৪০ টাকা। আমের ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ৮ কেজি।
আলাপকালে কৃষকরা অভিমানের সুরে বলেন, কৃষকের ফসল ফলানোই যেন আজন্ম পাপ। শুধু বদলগাছী হাটে নয়, বদলগাছী উপজেলাসহ জেলার প্রতিটি হাটেই এমন জুলুম চলছে। উপজেলার কোলা, ভান্ডারপুর, চাঁদপুর ও বদলগাছী বৃহত্তর চারটি সবজির হাট টেন্ডার না হওয়ায় সরকারি তত্ত্বাবধানে খাস আদায় হলেও সেই হাটগুলোতেও মানা হচ্ছে না সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম।
বদলগাছী উপজেলার চকনরেসিং গ্রামের কৃষক সাহানুর ইসলাম বলেন, আমাদের এমপি ফজলে হুদা বাবুল অনেক চেষ্টা করে ওজন বেশি নেওয়া বন্ধে কৃষি অধিদফতর থেকে একটি পরিপত্র করিয়েছেন শুনেছি। সেজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু সেই পরিপত্রের কোনো বাস্তব প্রয়োগ হাটে দেখছি না। ব্যবসায়ীরা জোর করে সবজি মণপ্রতি তিন থেকে চার কেজি বেশি নিচ্ছে। আবার কৃষকের নিকট হতে খাজনা নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও অন্যায়ভাবে খাজনা কাটা হচ্ছে। আমরা এই অন্যায়ের প্রতিকার চাই। অবিলম্বে সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের কার্যক্রম পদক্ষেপ দেখতে চাই। পরিপত্র শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে দেখতে চাই।
সবজি ব্যবসায়ী ওয়ারেজ বাবু বলেন, সবজি ভেজা থাকায় শুকিয়ে যায়। এ জন্য সামান্য ধলতা নিতে হচ্ছে। তবে কৃষকের থেকে খাজনা কাটা হলেও তা তারা নিচ্ছেন না। শুধু হাট ইজারাদারদের নির্দেশ পালন করছি। যেহেতু তাদের সঙ্গে আমরা হাট করছি সেজন্য তাদের কথা মানতে হয়। তারা যদি বলে তাহলে আমরা খাজনা নেবো না। আর সরকারি পরিপত্রের বিষয়ে আমরা অবগত নই। এ বিষয়ে সরকারি কোনো নির্দেশনা জানালে আমরা পালন করব।
উল্লেখ্য, জেলায় মোট ছোট-বড় ১০৪টি হাট রয়েছে। এসব হাটে অমিয়ম বন্ধে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসন অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা করেন কৃষকরা।
এএডি/