দলের ইশতেহার থেকে বাজেট

সাব্বির আহমেদ

রাজনীতি

নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছিল বিএনপি। যেখানে গুরুত্ব পেয়েছিল দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য

2026-06-13T04:40:59+00:00
2026-06-13T04:40:59+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
রাজনীতি
দলের ইশতেহার থেকে বাজেট
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৪:৪০ এএম 
সংগৃহীত ছবি
নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছিল বিএনপি। যেখানে গুরুত্ব পেয়েছিল দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’, হেলথ কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগগুলো। ক্ষমতায় এসেই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সেসব বিষয়গুলোই বাজেটে প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তবে ইশতেহারের লক্ষ্যগুলো সময়োপযোগী হলেও মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং বিশাল রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার কারণে তা বাস্তবায়ন করা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঁচ ভাগে ভাগ করে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। সেগুলো হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন; ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার; অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি। রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারকে আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে বিএনপি। এর মাঝে আছে গণতন্ত্র ও জাতিগঠন; মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান; সাংবিধানিক সংস্কার; সুশাসন এবং স্থানীয় সরকার।
আরও পড়ুন

বিএনপির ইশতেহারে যে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল- প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে।

প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রভৃতি।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে নির্বাচনি ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং তৃণমূল উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগগুলো সরাসরি বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের দাবি, এটি শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি।

বিএনপি সরকারের এ বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বাজেট উপস্থাপন করেন। এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষ্যমহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ ও শোভন, রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক এবং সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকের উন্নয়নের অভিযাত্রায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আগামী এক বছরের নীতি পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে দুই লাখ ৭৯ হাজার এক কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ), ভৌত অবকাঠামো খাতে এক লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা (১৮.৬৬ শতাংশ), সাধারণ সেবা খাতে দুই লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা (২৬.১৩ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটকে প্রকৃত অর্থেই নির্বাচনি ইশতেহারবান্ধব করতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি। জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সদিচ্ছা থাকতে হবে।

ইশতেহারের লক্ষ্যগুলো সময়োপযোগী হলেও মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং বিশাল রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার কারণে তা বাস্তবায়ন করা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান। 

সময়ের আলোকে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট মূলত তাদের নির্বাচনি ইশতেহার পূরণের লক্ষ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকার নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের এজেন্ডাকে সামনে রেখে এই বাজেট সাজিয়েছে। 

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও বাজেটে তার প্রতিফলন সম্পর্কিত কিছু প্রধান দিক হলো : সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিবার কার্ড। ইশতেহারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা। সরকার ইতিমধ্যেই এর মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে দিয়েছে এবং প্রথম ধাপে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে এর আওতায় আনতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই বিশ্লেষক বলেন, একটি গণমুখী ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ক্রমান্বয়ে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়নে বৈদেশিক ভাষা শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এবং স্টার্ট-আপ তহবিলের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্য এবারের বাজেটে ধরা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। 

এই অর্থনীতিবিদ সময়ের আলোকে বলেন, আমরা সবসময় বলে আসছি সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে। ফ্যামিলি কার্ড ফার্মার্স কার্ড সামাজিক সুরক্ষায় নতুন সংযোজন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে অনেক সময় দুই আড়াই হাজার টাকাও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। তবে এতে একটা শঙ্কা থেকে যায়- যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পায় না। এই সুবিধা পেয়ে থাকে যারা অপেক্ষাকৃত বিত্তবান। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি রোডম্যাপ ঠিক করা উচিত। 

তিনি বলেন, চিন্তার বিষয় হলো- এত বড় খাতের অর্থায়ন। এটি কোত্থেকে আসবে অর্থাৎ সক্ষমতা অর্জন বড় জরুরি। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কৃষক কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষায় বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। বাজেটে সেগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সহজেই বোঝা যাচ্ছে সরকার তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিফল ঘটাতে চেয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এ ছাড়া সরকারি চাকুরেদের বেতনভাতা অর্থাৎ পে-স্কেলের ঘোষণার মাধ্যমে একটি অর্থনৈতিক স্বস্তিও এসেছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এই পে-স্কেল পরোক্ষভাবে সরকারকে মাঠ পর্যায়ে এগিয়ে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা নির্বাচনের আগে দেশের প্রান্তিক মানুষের কথা চিন্তা করে অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। প্রস্তাবিত বাজেটে সেই প্রতিশ্রুতির ফলন ঘটেছে।

এএডি/
  বিষয়:   দল  ইশতেহার  বাজেট 


Advertisement
Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: