সাধারণত যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়ে যায়। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে সোনাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেও এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদা বাড়ার পরিবর্তে বিশ্ববাজারে সোনার দাম নিম্নমুখী হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৫ হাজার ৩০৩ ডলার। গত শুক্রবার (১২ জুন) তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও কেন কমছে সোনার দাম?
বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হচ্ছে সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো শিগগির সুদের হার কমাবে—এমন প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
বর্তমান বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালির সংকটকে উল্লেখ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের জেরে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি মূল্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারেও স্থবিরতার ইঙ্গিত মিলছে। ফলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ দ্রুত সুদের হার কমাবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
যদিও সোনা দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা বা ‘হেজ’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, তবু উচ্চ সুদের হার সাধারণত সোনার জন্য নেতিবাচক। কারণ, সোনা থেকে কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। তাই সুদবহনকারী সম্পদের রিটার্ন বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীরা সোনা থেকে সরে অন্য খাতে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
আর্থিক বিশ্লেষণভিত্তিক ওয়েবসাইট অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল বলেন, ‘সোনা প্রকৃত অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি সম্পদ। এটি কোনো লভ্যাংশ দেয় না। তাই মানুষ মূলত ভবিষ্যতে মূল্য বাড়বে—এই প্রত্যাশায় সোনা কেনেন।’
তিনি আরও বলেন, সুদের হার বাড়লে সোনা ও সুদবহনকারী সম্পদের মধ্যে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা সোনার পরিবর্তে ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রধান নির্বাহী কলিন প্লামের মতে, ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও সোনার দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘ডলার শক্তিশালী হলে সাধারণত সোনার দাম কমে যায়, আর ডলার দুর্বল হলে সোনার দাম বাড়ে। বর্তমানে ডলার শক্তিশালী থাকায় সোনার বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
তবে আগামী মাসগুলোতে সোনার বাজার কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
সূত্র : আলজাজিরা
/এসএকে