মাত্র ৯ বছরের শিশু। নাম তার জয়নাব বেগম। পৃথিবী কিংবা সীমান্তকে বোঝার ক্ষমতা এখনও তার খুব সীমিত। কিন্তু বুকের ভেতর অভিমান তৈরি হতে কোনো বয়স লাগে না বোধহয়। কখনও সামান্য বকুনি, অপূর্ণ চাওয়া, কখনওবা একটু অবহেলার অনুভূতি শিশুমনে ঝড় তুলতে পারে। জয়নাবের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।
শনিবার (১৩ জুন) সকাল ১০টা। ফুলবাড়ী উপজেলার মধ্য কাশিপুর ঘগোয়ারপাড় গ্রামের ছোট্ট জয়নাব স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। স্থানীয় মধ্য কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী তখন মায়ের কাছে খাবার চেয়েছিল। খুব সাধারণ আবদার। কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যে মা তাকে খাবার না দিয়েই স্কুলে পাঠিয়ে দেন। জয়নাবের ছোট্ট মন তখনই কিছুটা আহত হয়েছিল। দুপুর ১২টায় স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর বাবার কাছ থেকেও শুনতে হয় বকুনি। স্কুল ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে বাবা তাকে আবার স্কুলে যেতে বলেন। শিশুমনের জমে থাকা কষ্ট তখন অভিমানে রূপ নিল। মা কিংবা বাবা কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, এই অভিমান শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাবে।
বাড়ির আঙিনা, গ্রামের পথ পেরিয়ে, অজান্তেই সে পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছে। তারপর একসময় পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ-ভারত সীমারেখা। প্রবেশ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার সেউটি এলাকায়। কাঁটাতারের ওপারে দাঁড়িয়ে তখনও হয়ত সে বুঝতে পারেনি, নিজের দেশের সীমানা অতিক্রম করে ফেলেছে। কিন্তু সীমান্তরক্ষীরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাকে সীমান্ত অতিক্রম করার অপরাধে আটক করে।
দুপুর ১টার দিকে বিএসএফ শিশুটিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করলে- বিজিবি পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। সীমান্তের দুই প্রান্তে শুরু হয় টানটান উত্তেজনা। আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ৯৪৩-এর সাব-পিলার ৩-এর কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে অপেক্ষা, আলোচনা এবং অনিশ্চয়তা।
এদিকে, মা নাজমা বেগম স্কুলে মেয়েকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একসময় জানতে পারেন, সীমান্তে এক বাংলাদেশি শিশুকে বিএসএফ আটক করেছে। বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ কেঁপে ওঠে তার। পরে নিশ্চিত হন- সেই শিশুটি আর কেউ নয়, তার আদরের মেয়ে জয়নাব।
এ খবর পাওয়ার পর বিজিবি শিশুটির পরিচয় নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়। জানা যায়, জয়নাব বাংলাদেশের নাগরিক এবং তার সীমান্ত অতিক্রম করা ছিল সম্পূর্ণ অসচেতনতাবশত। এরপর শুরু হয় কূটনৈতিক যোগাযোগ। দিনভর উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার পর শনিবার রাত ১১টা ৩০ মিনিটে আন্তর্জাতিক মেইন পিলার ৯৪৩-এর ৩ এস-এর কাছে এক স্থানীয় বাসিন্দার বাড়ির পেছনে অনুষ্ঠিত হয় বিজিবি ও বিএসএফের জরুরি পতাকা বৈঠক। প্রায় ১৫ মিনিটের বৈঠক শেষে আসে কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত। রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
এরপর ঘটে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্বেগ ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জয়নাব ফিরে আসে তার মা-বাবার কাছে। সীমান্ত, কাঁটাতার, দুই দেশের বাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় জয়নাবের মায়ের বুকে ফেরার দৃশ্য।
/মহু