পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ‘কমিশনিং’ বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলাকালে শনাক্ত হওয়া কারিগরি বিচ্যুতি নিয়ে আতঙ্কিত বা বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। সংস্থাটির মতে, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে এ ধরনের ক্ষুদ্র ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন করা কমিশনিং প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক অংশ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে ‘চালুর আগেই গুরুতর কারিগরি ত্রুটির কারণে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে’—এমন তথ্য প্রচারিত হলে জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। তবে এসব দাবিকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান।
সোমবার (১৫ জুন) গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, এখানে আপসের কোনো সুযোগ নেই। কিছু মহলের প্রচারিত বিকৃত তথ্য অযথা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, যার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।
ড. জাহেদুল হাসান জানান, কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে একাধিক কঠোর পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
তিনি পরীক্ষার প্রযুক্তিগত দিক ব্যাখ্যা করে বলেন, সেকেন্ডারি সার্কিটে ৮ দশমিক ১ মেগাপাস্কাল চাপে পরিচালিত ‘লিক-টাইটনেস টেস্ট’ একটি বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত পরীক্ষা।
প্রতিবার কেন্দ্র শাটডাউন অবস্থা থেকে অপারেশনাল অবস্থায় যাওয়ার সময় এই পরীক্ষা করা হয়, যা বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শিল্পে একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া। এই পরীক্ষার সময়ই নির্ধারিত মানের তুলনায় একটি ক্ষুদ্র কারিগরি বিচ্যুতি শনাক্ত হয়।
তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের কঠোর নিরাপত্তা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ক্ষুদ্রতম বিচ্যুতিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বিচ্যুতি আগেভাগেই শনাক্ত হওয়া প্রমাণ করে যে প্রকল্পের নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা শতভাগ নিখুঁতভাবে কাজ করছে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি লোডিং বা কমিশনিং পর্যায়ে এ ধরনের ছোটোখাটো কারিগরি বিষয় সামনে আসা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে প্ল্যান্ট সম্পূর্ণ শাটডাউন করতে হতো। বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও তেমন নয় এবং এটিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনেরও কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, রূপপুর প্রকল্পকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামির মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেই প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের পর রূপপুরে আরও দুটি নতুন ইউনিট স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
প্রকল্প সূত্র অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রথম ইউনিট, গত ২৮ এপ্রিল এই ইউনিটে সফলভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে এর কমিশনিং কার্যক্রম চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে এই ইউনিট থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
দ্বিতীয় ইউনিট, এই ইউনিটের নির্মাণকাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৭ সালের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে এবং একই বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে দুটি ইউনিট থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/জোই