গতি হারিয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি

বদরগঞ্জ (রংপুর) সংবাদদাতা

সারাদেশ

রংপুর জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকল। সরকারি সিদ্ধান্তে ২০২০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে এই চিনিকলের উৎপাদন কার্যক্রম। অথচ

2026-06-16T05:28:55+00:00
2026-06-16T05:28:55+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
সারাদেশ
গতি হারিয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি
বদরগঞ্জ (রংপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ৫:২৮ এএম   (ভিজিট : ১৬)
সংগৃহীত ছবি
রংপুর জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকল। সরকারি সিদ্ধান্তে ২০২০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে এই চিনিকলের উৎপাদন কার্যক্রম। অথচ অবহেলিত এ জেলার হাজারো আখচাষি, শত শত শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিল এই চিনিকল। কলটি বন্ধ হওয়ায় এই অঞ্চলের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। পতিত হাসিনা সরকারের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শ্যামপুর চিনিকল চালু করতে বর্তমান সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন বিনিয়োগে কৃষিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে বিভিন্ন সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রস্তাবনা পাঠানো হলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। 

শ্যামপুর চিনিকল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান বলেন, মৌসুমি শ্রমিক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। হাসিনা সকারের সিদ্ধান্তে শ্যামপুর চিনিকলের মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হাজারো শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও আখচাষি, বেকার-যুবক, কুলি-মজুরদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্যামপুর চিনিকল চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন এ এলাকার মানুষ। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি চালুর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের হতাশা বাড়ছে। আমরা চাই বর্তমান সরকার আসন্ন বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চিনিকলটি সচল করুক।

আখচাষি ও চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ রংপুর জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি আর মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পিত ফাঁদের কারণে শ্যামপুরসহ দেশের বেশিরভাগ চিনিকল মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না পারায় যে লোকসান দেখানো হয়েছে, সেটাও সরকারের ব্যর্থতা ছিল। এখন বর্তমান সরকারের উচিত হবে আধুনিকায়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের রুজিরুটির এই ঠিকানার দ্বার খুলে দেওয়া। যাতে বেকার সমস্যা দূরীকরণসহ স্থানীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ফের গতি ফিরে আসে।

সরেজমিন দেখা গেছে, একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা চিনিকল এলাকাটিতে এখন নীরবতা। আগের মতো সেই ব্যবস্তা নেই। বেশিরভাগ দফতরে তালা ঝুলছে। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা মিললেও তাদের মুখে হাসি নেই। ছয় বছর বন্ধ চিনিকলের যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, বদলেছে যন্ত্রপাতিগুলোর রং। বেশিরভাগ নষ্ট হওয়ার উপক্রম। বিকল হয়ে পড়ে আছে আখ পরিবহনে ব্যবহৃত অনেক ট্রাক্টর ও কয়েকটি ট্রাক। প্রায় ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর গড়ে তোলা এই শিল্পকারখানা এলাকাটি এখন যেন ভূতের বাড়ি।

চিনিকল সূত্রে জানা যায়, কার্যক্রম চালু থাকাকালে এ মিলে সবশেষ ৪৯৩ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। মিলটি বন্ধের পর অনেকেই অবসর গ্রহণ করেন। কিছু জনবল অন্যান্য মিলে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে শ্যামপুর চিনিকলে ৬৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে সাতজন কর্মকর্তা ও ৯ জন শিক্ষকসহ ২৯ জন স্থায়ী, ৩২ জন পাহারাদার, একজন সুইপার ও একজন মুয়াজ্জিনসহ ৩৪ জন অস্থায়ী জনবল নিয়ে চলছে দাফতরিক কাজ।

শ্যামপুর চিনিকলের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক (এক্সটেনশন) জাহিদুল ইসলাম জানান, জয়পুরহাট চিনিকলের আওতায় (সাব-জোন) এবার ৩০০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। 

মাড়াইয়ের জন্য এখানকার আখ নিয়ে যাওয়া হয় জয়পুরহাট চিনিকলে। তবে নতুন করে মিল চালু কিংবা লাভজনক করতে গেলে কমপক্ষে তিন মৌসুম সময় প্রয়োজন। এক মৌসুমের আখ দিয়ে মিল চালু করা যায় না। এ মৌসুমে বরাদ্দ পেলেও পুরোপুরি চিনি উৎপাদনে যেতে তিন মৌসুম সময় লাগবে।

চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চিনিকলটি চালুর ঘোষণার পর কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়নি। যদি সরকারিভাবে অর্থ ছাড় হলে চিনিকল চালুর কার্যক্রম শুরু হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সভা-সমাবেশ, হরতাল-আন্দোলন করেও এটি চালুর ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখচাষিসহ কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী।

স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষ জনবল ও অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে চিনিকলটি লোকসানের মুখে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। আখের উৎপাদন হ্রাস এবং চিনিকলে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবকেও দুষছেন তারা। 

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ চিনিকলগুলো আবার চালু ও লাভজনকভাবে চালানোর জন্য টাস্কফোর্স গঠন করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশ তুলে নেয় বিএসএফআইসি।

টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল দুটিতে ২০২৭-২০২৮ মৌসুম থেকে আখ মাড়াই শুরু করতে তিন বছরে পর্যায়ক্রমে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করা হয়।
 ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর থেকে এ সহায়তার কথা বলা হয়।

বিএসএফআইসির নথিপত্র বলছে, ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে শ্যামপুর চিনিকলের জন্য ৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা চেয়ে গত বছরের ১৩ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির জবাবে গত বছরের ৩০ জুলাই বিএসএফআইসিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে অর্থ বিভাগ থেকে বিগত দুই দশকে ‘পরিচালন ঋণ’ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়। 

বিএসএফআইসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান এবং এ বাবদ সরকারি বিপুল ভর্তুকি  হ্রাসের উদ্যোগে চিনিকলগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। তাই অর্থ বরাদ্দে অসম্মতি জানায় অর্থ বিভাগ।

শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিগত হাসিনা সরকারের লোকজন পরিকল্পিতভাবে চিনিকলটিতে লোকসান দেখানো হয়েছে। এটি আধুনিকায়ন করলে পুনরায় লাভজনক করা সম্ভব।

পাকিস্তান শাসনামলে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরে ১৯৬৪ সালে চিনিকলটি স্থাপিত হয়। ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর নির্মিত এ চিনিকলে ১৯৬৭-১৯৬৮ সালে জাপানি কোম্পানি মিৎসুবিশি আনুষ্ঠানিকভাবে আখ মাড়াই কার্যক্রম শুরু করে। তিন বছরেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। দৈনিক আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা রাখা হয় এক হাজার ১৬ টন। বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ধরা হয় ১০ হাজার ১৬১ টন। 

১৯৭২ সালে চিনিকলটি জাতীয়করণ করার সময় বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১০ হাজার টন। তখনও লাভের মুখই দেখত প্রতিষ্ঠানটি। বছরে তিন মাস চালু থাকত চিনিকলের মেশিন। কিন্তু প্রেক্ষাপট বদলের সঙ্গে সঙ্গে লাভের অঙ্ক উল্টো পথে হাঁটতে থাকে। ২০০০ সাল থেকে শুরু হয় ধারাবাহিক লোকসান। ব্যাংক ঋণ, ঋণের সুদ ও শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন খাত মিলে শেষ পর্যন্ত লোকসান বেড়ে হয় কয়েকশ কোটি টাকা। সেই ধকল সামলানোর বিকল্প উপায় না খুঁজে ২০২০-২০২১ মাড়াই মৌসুম থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় শ্যামপুর চিনিকলের কার্যক্রম।

আরবিএন 


  বিষয়:   শ্যামপুর চিনিকল  রংপুর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: