কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার জন্য স্পেনের বিপক্ষে ড্র শুধু একটি ম্যাচ ছিল না, এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ম্যাচ শেষে মাঠে বসেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ৪০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।
ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি নির্বাচিত হন ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। পুরো ম্যাচে স্পেনের একের পর এক আক্রমণ রুখে দেন তিনি, অন্তত সাতটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেন নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায়। কিন্তু এই গৌরবের মুহূর্তের আড়ালে ছিল এক গভীর বেদনা—তার মা এই ঐতিহাসিক ম্যাচটি স্টেডিয়ামে এসে দেখতে পারেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সংক্রান্ত আর্থিক জটিলতার কারণে তার মা এই সফরে অংশ নিতে পারেননি। ভোজিনিয়া নিজেই জানান, এটি ছিল তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের। জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্তে মাকে পাশে না পাওয়ার আঘাত তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে না পেরে তিনি বলেন, আমি কেঁদেছি কারণ আমি আমার দাদা-দিদার সঙ্গে বড় হয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত তারা এখন আর বেঁচে নেই, কয়েক বছর আগেই তারা মারা গেছেন। তারা আমার জীবনের সবকিছু ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, আমি আবার কেঁদেছি কারণ আমার মা এখানে আসতে পারেননি ভিসা সমস্যার কারণে। ভিসার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন ছিল, সময়মতো আমরা সেটা জোগাড় করতে পারিনি। আমি চাইতাম তিনি এখানে থাকুন, কিন্তু আমি তবুও খুশি।
নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা বলতে গিয়ে ভোজিনিয়া বলেন, আমি আমার পুরো জীবন এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেছি। আমার বয়স এখন ৪০। আমি ২৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল শুরু করি, ২০১২ সালে। অনেক সময় মনে হয়েছে ছেড়ে দেব, কিন্তু আমি থামিনি, কারণ আমার স্বপ্ন ছিল এই জায়গায় পৌঁছানো।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও দলীয় সাফল্য তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ‘এই অর্জন সবার জন্য। আমাকে ম্যাচসেরা বলা হয়েছে, কিন্তু এটা আসলে আমার সতীর্থদের জন্য। তাদের ছাড়া কিছুই সম্ভব হতো না। আমি কেপ ভার্দের জন্য কাজ চালিয়ে যাব, দেশের মানুষের জন্য খেলব।’
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে কেপ ভার্দে ছিল রক্ষণাত্মকভাবে অত্যন্ত সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। বল দখলে স্পেন এগিয়ে থাকলেও তারা ভোজিনিয়ার দেয়াল ভাঙতে পারেনি। ফেরান তোরেসের একটি শট ক্রসবারে লাগে, আর বাকি সব আক্রমণ একের পর এক ঠেকিয়ে দেন এই ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক।
ভোজিনিয়া বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের একতা। আমরা এখানে শুধু ঘুরতে আসিনি। সবাই ভেবেছিল আমরা শুধু বিশ্বকাপ উপভোগ করতে এসেছি, কিন্তু আমরা এসেছি লড়াই করতে, আমাদের দেশের জন্য সম্মান অর্জন করতে।
তিনি আরও যোগ করেন, আমরা আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনা আর কোচের কৌশল অনুযায়ী খেলব। আমরা প্রতিটি ম্যাচে আরও ভালো করার চেষ্টা করব। আশা করি কিছু ম্যাচ জিততে পারব, আর কে জানে, হয়তো পরের রাউন্ডেও যেতে পারব।
কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা ভোজিনিয়ার বিষয়ে বলেন, সে আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েছিল। সে এখানে আসতে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে। ওর যে চোখের জল, সেটা ছিল সহনশীলতা আর লড়াইয়ের প্রতীক। আমি সাধারণত ব্যক্তিগতভাবে কোনো খেলোয়াড় নিয়ে কথা বলতে চাই না, কিন্তু আজ সে অসাধারণ খেলেছে।
তিনি আরও বলেন, পুরো দলই খুব শান্ত ছিল, আর সেই শান্ত পরিবেশই ভোজিনিয়াকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে এই ম্যাচ কেপ ভার্দের জন্য শুধু একটি ড্র নয়, বরং এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। আর ভোজিনিয়ার জন্য এটি ছিল জীবনের সেই মুহূর্ত, যেখানে গৌরব, কষ্ট, ভালোবাসা আর ত্যাগ একসাথে মিলেমিশে এক অবিস্মরণীয় গল্প তৈরি করেছে।
/ইউএমএইচ