নগরীতে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে কাজ শুরু করেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি)। মশা নিধনে নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ছেটানো হচ্ছে ঔষধ। এতে এবছর ডেঙ্গুর বিস্তার কমে আসবে বলে মনে করছে বিসিসি। ডেঙ্গু মোকাবেলায় সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্মকর্তারা। তবে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের।
৫৮ বর্গ কিলোমিটারের বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করেছে সিটি কর্পোরেশন। গত মে মাসকে পরিচ্ছন্নতার মাস ও জুন মাসকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকাকে মশক নিধন মাস হিসেবে ঘোষণা করেন বিসিসি প্রশাসক। পাশাপাশি ৩০ দিন একটি করে ওয়ার্ডে মশার ঔষধ ছেটানোর ঘোষণা দেন বিসিসি প্রশাসক। এলক্ষে বিসিসির ৪২ জন কর্মী ৪৫ টি ফগার মেশিন, ৩৫ হ্যান্ড স্প্রে নিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বলে জানিয়েছে বিসিসির প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
এবিষয়ে বিসিসির প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বলেন, বিসিসি প্রশাসক জুন মাসকে মশক নিধন মাস ঘোষণা করেছেন। এর জন্য পাঁচটি টিম গঠন করে করা হয়েছে। আমাদের ৩৫ টি হ্যান্ড স্প্রে ও ৪৫ টি ফগার মেশিন রয়েছে। এর পাশাপাশি একটি জরুরী টিমও গঠন করা হয়েছে। আমরা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে র্যালি, ২০ হাজার লিফলেট বিতরণ করছি। শেবাচিমে যতজন আক্রান্ত আছে তার মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের কোন রোগী নেই। এথেকে বোঝা যায় আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি।
বিসিসির এমন কর্মকাণ্ডকে স্বগত জানিয়েছে নগরবাসী। তারা বলছে মশার উপদ্রব বিগত বছরের চেয়ে অনেকটাই কমেছে। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি জনগণ সচেতন হলে ডেঙ্গু থেকে মুক্তি মিলবে। তবে বর্ষা মৌসুমে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দাবি নগরবাসীর।
নগরীর বাসিন্দা আনিচুর রহমান বলেন, সিটি কর্পোরেশন যে উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিগত বছরে মশা বা ডেঙ্গুর যে প্রকোপ ছিল এ কারণে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে। গতবারের চেয়ে এ বছর সিটি কর্পোরেশন যে মশার স্প্রে করছে, বাসা বাড়িতে যেসব কার্যক্রম চালাচ্ছে, মানুষকে যেভাবে সচেতন করছে এতে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশার প্রভাব কমেছে। এতে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা শুধু সিটি কর্পোরেশনের উপরই যদি ছেড়ে দেই তাহলে হবে না আমাদের জনগণ কেউ সচেতন হতে হবে। এভাবে আমাদের দায়িত্ব কে আরও বাড়াতে হবে।
নগরীর বাসিন্দা জামাল খলিফা বলেন, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় যে মশার উপদ্রব আগের চেয়ে একটু কমেছে। কিন্তু এটি চালু রাখতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে। সামনে বর্ষার মৌসুম এর কার্যক্রম কমানো যাবে না। জনগণেরও পরিষ্কার থাকা উচিত এবং সিটি কর্পোরেশনকে বলা উচিত এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে।
নগরীর বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, মশার ওষুধ না ছিটালে মশার ভয়াবহতা আরো বাড়বে এর আগেও অনেকে আক্রান্ত হয়েছে। আমার বাড়ির আশপাশ আমি মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করি। কিন্তু সবাই করছে না। সবারই পরিষ্কার হয়ে থাকা উচিত যাতে ডেঙ্গু না হয়। যদি পরিষ্কার থাকে তাহলে ডেঙ্গুতেও বাসা বাঁধতে পারবেনা আর রোগ ছড়াবে না।
বিগত বছরের তুলনায় বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার কমেছে বলে জানিয়েছে বিসিসির মেডিকেল অফিসার। মশক নিধন কার্যক্রম ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গু এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি তার।
বিসিসির মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি বলেন, বর্তমানে আগের থেকে আমরা অনেক ভালো অবস্থানে আছি। যেহেতু মানুষকে আমরা সচেতন করতে পারছি। আমরা মশক নিধন কার্যক্রম করছি, র্যালি করছি এগুলোর মাধ্যমে আমরা আশা করছি মানুষ সচেতন হচ্ছে পাশাপাশি মশার বিস্তার কমে আসছে। আর এজন্য আক্রান্তের হারও কমেছে। আমরা শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল ও অন্যান্য প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে খবর নিয়েছি এখনো আক্রান্তের হার অতটা বৃদ্ধি পায়নি।
ডেঙ্গু এখন পর্যন্ত আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে বলে বলতে পারি। আশা করছি আরো নিয়ন্ত্রণে আসবে। ডেঙ্গুকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি একটা প্রতিষেধক একটা প্রতিরোধক মূলক। এজন্য আমাদেরকে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এজন্য সাধারণ মানুষকেও দায়িত্ব নিতে হবে, বলেও যোগ করেন তিনি।
চলতি বছর বরিশাল জেলায় ৩৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৪ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। চলতি বছর জুন মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কারো মৃত্যু হয়নি। আর বর্তমানে জেলার ১৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তারা সবাই বরিশাল জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা।
ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে ইতোমধ্যে জুন মাসকে মশক নিধন মাস ঘোষণা করেছে বিসিসি। ইতোমধ্যে নগরবাসীর দাবির মুখে মশা নিধনের জন্য কার্যকর নতুন ঔষধ আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিসিসি প্রশাসক। ডেঙ্গু ও চিকন গুনিয়া রোধে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন বিসিসির প্রশাসক।
এবিষয়ে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ডেঙ্গুর প্রধান বাহক হচ্ছে মশা। তাই জুন মাসকে আমরা মশকনিধন মাস ঘোষণা করেছি। পাশাপাশি ৩০টি ওয়ার্ডে আলাদা করে গ্রুপ করে দিয়েছি। প্রতিদিন ৬ থেকে সাতটি ওয়ার্ডে মশার ওষুধ দেয়া হবে। যেহেতু একটি দাবি উঠেছিল মশার ওষুধে কাজ হচ্ছে না তাই আমরা ভালো মানের একটি ওষুধ নিয়ে এসেছি।
ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আমরা ড্রেন ও খাল পরিষ্কার করছি। অনেক ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলোকে সচল করার চেষ্টা করছি। পানি যাতে শহরে না জমে সেই চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। এর জন্য নগরবাসী সহযোগিতা দরকার তাদেরকেও সচেতন হতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে, বলেও যোগ করেন তিনি।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৯৮ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১ হাজার ৩১৯ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৭৯ জন রোগী। চলতি বছর এপর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারো মৃত্যু হয়নি।
সময়ের আলো/আতা