ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার লড়াই মানেই ইউরোপিয়ান ফুটবলের দুই ভিন্ন ধাঁচের দর্শনের সংঘর্ষ, যেখানে একদিকে ইংল্যান্ডের গতি, শারীরিক শক্তি ও দ্রুত আক্রমণভিত্তিক ফুটবল, অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং বিশ্বমানের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের ক্লাসিক কৌশল মুখোমুখি হয়।
এবারের বিশ্বকাপে এই গ্রুপকে ইতিমধ্যেই ‘গ্রুপ অব ডেথ’ বলা হচ্ছে, ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার পাশাপাশি আরও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দল থাকায় এখানে প্রতিটি ম্যাচই নকআউট পর্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বৃহস্পতিবার ডালাস স্টেডিয়ামে শুরু হবে এই মহারণ।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে দুই দলের লড়াই বেশ সমানতালে এগিয়েছে এবং উত্তেজনায় ভরপুর ছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত আসে ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে, যেখানে সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়া অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে যায়। সেই ম্যাচটি ইংল্যান্ডের জন্য ছিল বড় হতাশার, আর ক্রোয়েশিয়ার জন্য ছিল ইতিহাস গড়ার রাত। এরপর ইউরো ২০২০-এ ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জয় পেয়ে সেই পরাজয়ের কিছুটা প্রতিশোধ নেয়।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ইংল্যান্ড ৪র্থ স্থানে অবস্থান করছে, অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া ১১তম অবস্থানে। র্যাংকিংয়ে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও বড় টুর্নামেন্টে ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা এবং মানসিক দৃঢ়তা তাদের সমান প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেয়।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ক্রোয়েশিয়া তুলনামূলক নতুন শক্তি হলেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৮ বিশ্বকাপে তারা রানার্সআপ হয়ে পুরো বিশ্বকে চমকে দেয় এবং ২০২২ বিশ্বকাপে আবারও সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে নিজেদের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালে একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের পর দীর্ঘ সময় ধরে ট্রফির খোঁজে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে। ২০১৮ সালে সেমিফাইনাল এবং ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে আবারও শিরোপার কাছাকাছি যেতে শুরু করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের অধীনে দারুণভাবে বাছাইপর্ব পার করেছে। তারা ৮ ম্যাচে ৮ জয় তুলে নিয়ে ২২ গোল করে এবং একটিও গোল হজম না করে বিশ্বকাপে এসেছে, যা তাদের রক্ষণভাগের অসাধারণ শৃঙ্খলা দেখায়। শেষ দিকে তারা আবারও ছন্দে ফিরে এসেছে। নিউজিল্যান্ডকে ১-০ এবং কোস্টারিকাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া তাদের পরিচিত ধীর, নিয়ন্ত্রিত এবং টেকনিক্যাল ফুটবল ধরে রেখেছে। তারা বাছাইপর্বে ৭ ম্যাচে জয় এবং মাত্র ১ ড্র নিয়ে শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপে এসেছে। তবে ২০২৬ সালের প্রস্তুতি পর্বে তাদের পারফরম্যান্স কিছুটা মিশ্র। বেলজিয়ামের কাছে হার এবং স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে কঠিন জয় দেখিয়েছে যে তারা এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, যদিও বড় ম্যাচে তারা সবসময়ই বিপজ্জনক দল।
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা হ্যারি কেইন, যিনি নিয়মিত গোল করে দলের আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেন। মাঝমাঠে ডেকলান রাইস দলকে ভারসাম্য দেন এবং রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেন। তরুণ উইঙ্গার বুকায়ো সাকা ফিট থাকলে ইংল্যান্ডের আক্রমণ আরও গতিশীল ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
ক্রোয়েশিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নাম লুকা মদ্রিচ, যিনি বয়স বাড়লেও এখনও বিশ্বের সেরা প্লেমেকারদের একজন। তার সঙ্গে মাতেও কোভাচিচ মাঝমাঠে গতি, পাসিং এবং বল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রক্ষণভাগে জোসকো গভার্দিওল এবং গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ ক্রোয়েশিয়ার শক্ত ভিত্তি তৈরি করেন।
ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি লড়াই সবসময়ই টানটান উত্তেজনার। ২০১৮ সালের সেমিফাইনাল এখনও ইংল্যান্ড সমর্থকদের জন্য বড় আক্ষেপ, আর ক্রোয়েশিয়ার জন্য তা গর্বের ইতিহাস। এই ম্যাচের প্রতিটি অধ্যায়ই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও গভীর করেছে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে এ টি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে, যেখানে ‘গ্রুপ অফ ডেথ’ পরিস্থিতির কারণে জয় পাওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই গ্রুপে প্রতিটি পয়েন্টই পরবর্তী রাউন্ডের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
ইংল্যান্ড তাদের গতি, উইং প্লে এবং দ্রুত আক্রমণ দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে, অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া মাঝমাঠে বল দখল রেখে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইবে। ম্যাচের মূল লড়াই হবে মাঝমাঠে, বিশেষ করে ডেকলান রাইস বনাম লুকা মদ্রিচ দ্বৈরথে, যা পুরো ম্যাচের গতি নির্ধারণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে এটি হতে যাচ্ছে একদম সমান শক্তির, ট্যাকটিক্যালি সমৃদ্ধ এবং উচ্চমানের একটি ফুটবল ম্যাচ। ছোট ছোট মুহূর্ত, সেট-পিস এবং ব্যক্তিগত ভুলই ফলাফল নির্ধারণ করবে।
/এসএকে