দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার রংপুর বিভাগ। প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের এই অঞ্চলের অধিকাংশই কৃষিনির্ভর। নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও ভূমিহীনতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যায় জর্জরিত এ অঞ্চলের মানুষ। অথচ জাতীয় বাজেটে বরাবরের মতো এবারও রংপুর বিভাগকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট ঘোষণা করা হলেও রংপুর বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি, যার সুনির্দিষ্ট হিসাবও স্পষ্ট নয়। ফলে বাজেট বৈষম্যের শিকার হয়েছে উত্তরাঞ্চলের মানুষ। এ নিয়ে সাধারণ জনগণ, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও সুধীসমাজের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের প্রায় ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ খেতমজুর, ২৭ শতাংশ শ্রমিক, ১০ শতাংশ প্রান্তিক কৃষক, ৬ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ২ শতাংশ অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি হলেও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাজেটে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি হলেও এবারের বাজেটেও এ প্রকল্পের কোনো সুস্পষ্ট অগ্রগতি বা বরাদ্দের ঘোষণা নেই। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকায় রংপুর সিটি করপোরেশনের নামও উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে রংপুরে হাইটেক পার্ক, নভোথিয়েটার, রেলপথ উন্নয়নসহ অন্তত দুই ডজন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাজেটে এসব প্রকল্প পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা বা বরাদ্দের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
উত্তরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের কথা বলা হলেও সেই অর্থ কোন কোন জেলায় এবং কীভাবে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে কৃষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও রংপুর বিভাগে উল্লেখযোগ্য শিল্পায়ন গড়ে ওঠেনি। একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড ছাড়া বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলতে তেমন কিছু নেই। ফলে কৃষির ওপরই নির্ভর করে টিকে আছে এ অঞ্চলের অর্থনীতি।
পরিবেশবাদী সংগঠন বাপার রংপুর জেলা সদস্যসচিব রশিদুস সুলতান বাবলু, রংপুর জেলা সুজনের সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রংপুর আইনজীবী সমিতির জয়েন্ট সেক্রেটারি এডভোকেট একেএম হারুন উর রশিদ, সময়ের আলো কে বলেন জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও উন্নয়ন বরাদ্দে রংপুরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য করা হচ্ছে। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষকরা ধান, আলুসহ বিভিন্ন ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উন্নয়নের মূলধারায় রংপুরকে আনতে বিশেষ বরাদ্দ ও কার্যকর পরিকল্পনা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, রংপুর বিভাগের দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদী ব্যবস্থাপনা, শিল্পায়ন ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ না করলে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য আরও বাড়বে।
সময়ের আলো/আতা