মাত্র চার মাস আগে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর। শ্রমবাজার ও প্রবাসীদের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফি
সময়ের আলো : প্রধানমন্ত্রীর সফরে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে জটিলতার নিরসন হবে কি না?
নুরুল হক নুর : আমরা আশাবাদী। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যদি মিডল ইস্ট সফর করতে পারেন এই বাজারে একটা ভালো সম্ভাবনা তৈরি হবে। মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রধান কারণ হচ্ছে এটা আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। প্রধানমন্ত্রীর দর্শন যে ‘বাংলাদেশ ফাস্ট’, বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি মালয়েশিয়া সফর করছেন। আমরা আশাবাদী যে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে যে সংকট, গত কয়েক বছর ধরে যে বাজারটা বন্ধ আছে, আশা করি প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে সেটা অনেকটা উন্মুক্ত হবে।
রাজনীতিবিদ থেকে মন্ত্রী। দায়িত্বের প্রথম চার মাস কেমন কাটল?
রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্য জনপ্রতিনিধি হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। আমরা ২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে এসেছি এবং দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাজনীতি করেছি। নানা ধরনের নির্যাতন, মামলা ও চাপের মধ্যেও পরিবর্তনের যে স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলাম, তা থেকে সরে আসিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার একজন তরুণ সদস্য হিসেবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। দায়িত্বটি যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি গর্বেরও।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে সবচেয়ে বড় কী প্রতিবন্ধকতা দেখেছেন?
বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য প্রশাসনকে জনমুখী করা এবং সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতির কারণে অনেক জায়গায় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার মানসিকতার ঘাটতি রয়েছে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে দেখেছি, বিদেশগামী কর্মীদের নানা সমস্যার দ্রুত সমাধানে প্রয়োজনীয় আন্তরিকতা ও তৎপরতা সবসময় দেখা যায় না। কোথাও কোথাও সেবার গতি ধীর। আমরা এসব বিষয় চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। বর্তমানে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রথমত বিদেশে যেতে কর্মীদের যে উচ্চ ব্যয় হয়, তা কমানো। দ্বিতীয়ত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে ভালো বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো। তৃতীয়ত প্রবাসীদের কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বিদেশে দীর্ঘদিন কাজ করে দেশে ফিরে অনেকেই সম্পত্তি জটিলতা, প্রতারণা কিংবা সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যার সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জোরদার করাই আমাদের লক্ষ্য।
মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে যে জটিলতা রয়েছে, তা নিরসনে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
আমাদের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে যান। তাই এই অঞ্চল আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আচরণগত ও অন্যান্য সমস্যার কারণে কয়েকটি দেশ নিয়োগ কমিয়েছে বা সীমিত করেছে। কোথাও কোথাও বাজার আংশিকভাবে বন্ধও রয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বাড়াচ্ছি। কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে, যাতে আগের মতো সুযোগ ফিরে আসে। আমরা আশাবাদী, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরগুলো শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ফ্রি ভিসার নামে প্রতারণা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
প্রথমেই আমি বলতে চাই, ফ্রি ভিসা নামে বাস্তবে কোনো বিষয় নেই। এই ধরনের প্রলোভনকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি প্রতারণা হয়। মানুষকে সচেতন হতে হবে। যে এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাবেন, তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে হবে। কারণ অভিযোগ এলে প্রমাণ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যদি কোনো এজেন্সি প্রতারণা করে, তা হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল এবং আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি। তবে তার জন্য ভুক্তভোগীদের তথ্য ও নথিপত্র থাকতে হবে।
দক্ষ কর্মীর অভাবকে অনেকেই বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন। এ ক্ষেত্রে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা জরুরি। আমাদের অধীনে প্রায় ১১০টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) রয়েছে। এগুলোকে যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। বর্তমানে বিদেশে শুধু শ্রমশক্তি নয়, দক্ষ অপারেটর, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মী ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। অনেক কাজ এখন মেশিননির্ভর। তাই প্রশিক্ষণ কাঠামো আধুনিক করতে হবে। আমরা চাই, বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীরা অন্তত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে যাক।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা ইতিবাচকভাবে বেড়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করা। সে জন্য আমরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত একটি প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে প্রবাসীরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবায় অগ্রাধিকার পাবেন। মেডিকেল সুবিধা, বিনিয়োগসহ নানা সেবার সঙ্গে এই কার্ড যুক্ত থাকবে। যেহেতু ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে এটি সংযুক্ত থাকবে, তাই বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও বাড়বে। আমরা মনে করি, এতে হুন্ডির ব্যবহার আরও কমে আসবে।
এই কার্ডের সঙ্গে কি বীমা সুবিধাও থাকবে?
বর্তমানে যারা বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বিদেশে যান, তারা বিভিন্ন ধরনের বীমা সুবিধা পান। দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিপূরণ এবং বীমা সুবিধা মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়। কিন্তু অনেকেই নিয়ম মেনে নিবন্ধন না করে বিদেশে যান। ফলে বিপদে পড়লে তারা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এমনকি মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়। আমাদের ওয়েলফেয়ার বোর্ডে পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে, কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত কর্মীদের জন্যই তা ব্যবহার করা যায়। তাই আমরা চাই, সবাই নিয়ম মেনে বিদেশে যাক এবং সুরক্ষার আওতায় আসুক।
আগামী দুই-তিন বছরে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে কোথায় দেখতে চান?
সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে এক কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। সে অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে জনশক্তির চাহিদা মূল্যায়ন করা হয়েছে। আমরা শুধু প্রচলিত শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকে বিদেশে পাঠানোর সুযোগও বাড়াতে চাই। এ জন্য দূতাবাসগুলোকে মাইগ্রেশন ডিপ্লোম্যাসি জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।