মহাপ্রলয়ের কারণ জানাবে ‘পৃথিবীর ব্ল্যাক বক্স’

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

বছরের পর বছর নিজেদেরই সৃষ্ট কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নাস্তানাবুদ মনুষ্য দুনিয়া। ক্রমাগত আয়ু ফুরোচ্ছে পৃথিবী নামক নীল

2026-06-19T02:51:45+00:00
2026-06-19T02:51:45+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মহাপ্রলয়ের কারণ জানাবে ‘পৃথিবীর ব্ল্যাক বক্স’
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ২:৫১ এএম 
আগামী ডিসেম্বরে তাসমানিয়ার কুইন্সটাউনে স্থাপিত হতে চলা ‘পৃথিবীর ব্ল্যাক বক্স’- এর মডেল। ছবি : দ্য গার্ডিয়ান
বছরের পর বছর নিজেদেরই সৃষ্ট কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নাস্তানাবুদ মনুষ্য দুনিয়া। ক্রমাগত আয়ু ফুরোচ্ছে পৃথিবী নামক নীল গ্রহটির। আর এই একটু একটু করে কেয়ামত বা মহাপ্রলয়ের দিকে এগোতে থাকা বিশ্বের ধ্বংস হওয়ার কারণ জানতে অস্ট্রেলিয়ার দ্বীপরাজ্য তাসমানিয়ার এক প্রত্যন্ত বিমানঘাঁটিতে বসানো হচ্ছে পৃথিবীর ‘ব্ল্যাক বক্স’। কোনো বিমান বিধ্বস্ত হলে যেমন তার ‘ব্ল্যাক বক্স’ থেকে দুর্ঘটনার সব তথ্য জানা যায় তেমনি পৃথিবী কীভাবে মহাপ্রলয়ের শিকার হলো তার তথ্যই বছর শেষে সংরক্ষিত থাকবে তাসমানিয়ায় স্থাপিত হতে চলা ‘ব্ল্যাক বক্সে’।

নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাউজার ল্যাব জানিয়েছে, ইস্পাত দিয়ে তৈরি এই কাঠামোটি মানবজাতির জলবায়ু সংকটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ‘প্রতিটি ঘটনা’ রেকর্ড করে রাখবে। এটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে বিশ্ব মহাপ্রলয়ের মুখে পড়লেও ব্ল্যাক বক্সটি টিকে থাকতে পারে এবং এটি যেন মানবজাতির ব্যর্থতার শেষ সাক্ষ্য হিসেবে থেকে যায়। 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, কিছু দিন আগেও মনে হচ্ছিল ‘পৃথিবীর ব্ল্যাক বক্স’ প্রকল্পটি প্রাথমিক পরিকল্পনার পর্যায়টুকুও পার করতে পারবে না। তবে এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। প্রচুর আলোচনা ও ঘোষণার প্রায় পাঁচ বছর পর নীরবতা ভেঙে প্রকল্পটি আবার আলোচনায় ফিরেছে। 


অস্ট্রেলীয় নির্মাতারা জানিয়েছেন, বক্সের বিভিন্ন অংশ তৈরি ও জোড়া লাগানোর কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে তাসমানিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের কুইন্সটাউনের কাছে অবস্থিত একটি নির্জন বিমানঘাঁটির এক প্রান্তে পুরো কাঠামোটি বসানো হবে। 

এ প্রকল্পটি যখন প্রথম ঘোষণা করা হয় তখন বলা হয়, জলবায়ু সংকটের সাক্ষী হিসেবে তাসমানিয়ার এক দূরবর্তী এলাকায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারবে- এমন একটি যন্ত্র বসানো হবে। তখন সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল এই খবর।

মার্কিন মিডিয়া ওয়েবসাইট সিএনইটি সেই সময় শিরোনাম করেছিল, সভ্যতার পতনের কারণগুলো রেকর্ড করার জন্য পৃথিবীকে দেওয়া হচ্ছে ব্ল্যাক বক্স। শিরোনামটি পরে স্টিফেন কোলবার্টের বিখ্যাত টক শোতেও উল্লেখ করা হয়েছিল। শোতে কোলবার্ট ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কৌতুক করে বলেছিলেন, তা হলে তো আমরা শেষের পথেই এগোচ্ছি।
প্রকল্পের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৬ মিটার লম্বা ও ৪ মিটার উচ্চতার এই ইস্পাতের কাঠামোর ওপরে কাচের আড়ালে সোলার প্যানেল লাগানো থাকবে। 

এর কাজ হবে জলবায়ু বিপর্যয়ের সৃষ্টি করা মানবজাতির প্রতিটি ঘটনা রেকর্ড করা। ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, আমাদের গ্রহের সুস্থতা সম্পর্কিত শত-সহস্র তথ্য, পরিমাপ ও বিভিন্ন ঘটনাবলি অবিরাম সংগ্রহ করা হবে এবং নিরাপদে সংরক্ষণ করে রাখা হবে ভবিষ্যৎ কোনো প্রজন্মের জন্য। এ গল্পটি কীভাবে শেষ হবে, তা পুরোপুরি আমাদের হাতেই। শুধু একটি বিষয় নিশ্চিত তোমাদের (পৃথিবীবাসীর) প্রতিটি কাজ, অকাজ ও পারস্পরিক সম্পর্ক এখন রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে।

এই প্রকল্পটির অনুপ্রেরণা এসেছে বিমানের ফ্লাইট রেকর্ডার থেকে, যেটিকে সাধারণত ‘ব্ল্যাক বক্স’ বলা হয়। নামে ব্ল্যাক থাকলেও বাস্তবে এগুলো কমলা রঙের হয়। বক্সগুলো এমন আবরণে মোড়ানো থাকে যাতে বিমান দুর্ঘটনার সময়ও নষ্ট না হয় এবং পরে তদন্তকারীরা যেন দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন করতে পারেন। 

উল্লেখ্য, বিমানের ব্ল্যাক বক্স ধারণাটিও অস্ট্রেলিয়ার আবিষ্কার। ১৯৫৪ সালে মেলবোর্নের একটি সরকারি গবেষণা কেন্দ্রে এর প্রথম নমুনা তৈরি করা হয়।


২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জাতিসংঘের সিওপি বা কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলনের সময় পৃথিবীর ব্ল্যাক বক্স প্রকল্পটি প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল। সম্মেলন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল হার্ড ড্রাইভ চালু করে তথ্য সংগ্রহ শুরু করা হয়েছিল, যা পরে মূল বক্সে স্থানান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু তারপর হঠাৎই সবকিছু নীরব হয়ে পড়ে। প্রকল্পের ইনস্টাগ্রাম পাতায় শেষ ও একমাত্র পোস্টটি পাওয়া যায় ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে, যেখানে শুধু কালো রঙের একটি বক্সের ছবি দেওয়া আছে।

কেউ কেউ তখন সন্দেহ প্রকাশ করেন, এটি আসলে কোনো শিল্প প্রদর্শনী বা প্রচারের কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ এই প্রকল্পটি বিজ্ঞানীদের নয় বরং অস্ট্রেলিয়ার একটি অলাভজনক সংস্থা ‘রাউজার ল্যাব’ যারা নিজেদের ‘পরীক্ষামূলক পরিবেশসংক্রান্ত তথ্য-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান’ বলে পরিচয় দেয়, তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত।

সংস্থাটির শিল্প পরিচালক জোনাথন নিবোন জানিয়েছেন, এখন এই প্রকল্পটি ‘পৃথিবীর ব্ল্যাক বক্স ফাউন্ডেশন’ নামে একটি নিবন্ধিত দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি দ্য গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়াকে বলেন, প্রথম ঘোষণার প্রায় পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক সময়েই আমরা অবশেষে এই কাঠামোটি স্থাপন করতে পারছি। এই পাঁচ বছরে আমরা এর নকশা, তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি, ব্যবহৃত উপকরণ, ওয়েব প্ল্যাটফর্মসহ সবকিছু উন্নয়নে কাজ করেছি। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতেও প্রকল্পটি চালু রাখার জন্য অর্থসংস্থানের ব্যবস্থাও তৈরি করেছি।

রাউজার ল্যাবের দাবি, তাদের জলবায়ুসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ সারা বিশ্বে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এই ব্ল্যাক বক্স তৈরিতে ‘দ্য গ্লু সোসাইটি’ নামের শিল্পী ও পরিচালকদের দল এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘রিভলভার’ সহযোগিতা করছে। শুরুর দিকে তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু তারা এই কয়েক বছরের মধ্যে প্রকল্প থেকে সরে এসেছে এবং রাউজার ল্যাবের ওয়েবসাইট থেকে নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার অনুরোধ করেছে।

এ ব্যাপারে তাসমানিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় পরিষদের মেয়র শেন পিট বলেছেন, ব্ল্যাক বক্স প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ নিতে বেশ সময় লেগেছে।

তবে নিঃসন্দেহে এটি আমাদের এলাকার জন্য একটি দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, তাসমানিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের পাথুরে ও প্রত্যন্ত এলাকাটি বেছে নেওয়ার কারণ হলো এখানকার ভূ-প্রকৃতি ও রাজনৈতিক অবস্থা খুবই স্থিতিশীল। এই অঞ্চলটি প্রাচীনকালে হিমবাহের কারণে তৈরি হয়েছে। পিটের ভাষায়, এই পশ্চিমাঞ্চল এমন কোনো জায়গা নয়, যেখানে কেউ বড় ধরনের ক্ষতি বা বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে।

এ বছর বিশ্ব ধ্বংসের আশঙ্কা নিরূপণকারী ‘ডুমসডে ক্লক’-এর সময় দেখানো হয়েছে মধ্যরাতের মাত্র ৮৫ সেকেন্ড আগে, যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কাছের অবস্থান। ২০২১ সালে এই সময়টি ছিল ১০০ সেকেন্ড। 

দ্য গার্ডিয়ান তাদের প্রতিবেদনের শেষে উল্লেখ করে এখন প্রশ্ন হলো, যদি কখনো এই পৃথিবীর ব্ল্যাক বক্স সম্পূর্ণভাবে তৈরি ও চালু হয় তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বা অন্য কোনো প্রাণী এর রেকর্ড ঘেঁটে জানতে পারবে কি না যে পৃথিবীর এমন দুর্দশার কারণ কী ছিল?

নাকি মানুষ সচেতন হয়ে বিপদ এড়িয়ে যেতে পারবে যার ফলে তাসমানিয়ার পাথুরে জমির ওপর বসতে যাওয়া এই অদ্ভুত যন্ত্রটি হয়তো এমন এক ধ্বংসের স্বাক্ষী হবে, যা কখনো আসবেই না? হয়তো ব্ল্যাক বক্সের বৈশিষ্ট্যই এমন যে, এটি এমন এক বস্তু, যার ভেতরের কাজ ও রহস্য সাধারণের কাছে অজানাই থেকে যায়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   মহাপ্রলয়  পৃথিবী  ব্ল্যাক বক্স 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: