এক দিন আগেই বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছিল তিন মহাতারকার ব্যক্তিগত শিল্প প্রদর্শনীর মঞ্চ। কিলিয়ান এমবাপে জোড়া গোলে ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। আর্লিং হালান্ড বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচেই করেছেন জোড়া গোল। আর লিওনেল মেসি? আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
এত কিছুর পর সব আলো, সব আলোচনা তখন এক ব্যক্তির অপেক্ষায়। ৪১ বছর বয়সি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কি পারবেন নিজের নামটিও সেই তালিকায় যোগ করতে? তিনি কি হতে পারবেন ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম ফুটবলার? কিন্তু হিউস্টনের রাতটা তার জন্য ছিল হতাশার, অস্বস্তির এবং হাজারো প্রশ্নের।
পাঁচ মিনিটের মাথায় এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ডি আর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেছে পর্তুগাল। আর পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন রোনালদো। গোলের জন্য তার আকুতি ছিল স্পষ্ট কিন্তু সেই আকুতিই যেন কখনো কখনো দলীয় স্বার্থ ছাপিয়ে গেছে।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে দ্বিতীয়ার্ধে। ব্রুনো ফার্নান্দেজ গোল করার আদর্শ জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু কাট-ব্যাক পাসের পথে চলে আসেন রোনালদো নিজেই। ফলে নষ্ট হয়ে যায় সম্ভাবনাময় সুযোগটি। এই দৃশ্য দেখে সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি রোনালদোকে উদ্দেশ করে সরাসরি বলেন, সে যদি ছয় গজের বক্সে ঢুকত, তা হলে ডিফেন্ডার তাকে অনুসরণ করত এবং ব্রুনোর জন্য সহজ ট্যাপ-ইন হয়ে যেত। কিন্তু গোল করতে চাওয়ার কারণে সে পাসের পথেই চলে এসেছে। আমার কাছে বিষয়টা সহজ, দলকে গোল করতে হবে, তোমাকে নয়।
এই ম্যাচে মাঠে নামার মাধ্যমে ৪১ বছর ১৩২ দিন বয়সে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সি আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে শুরুর একাদশে নামার রেকর্ড গড়েন রোনালদো। তাই অবাক হয়েছেন অনেকেই, যখন পুরো ৯০ মিনিট তাকে মাঠে রেখে দেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ।
বিবিসি রেডিওতে ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন বলেন, এটা মার্তিনেজের জন্য বিব্রতকর। হয়তো কাজ করতে পারে কিন্তু আমরা কি সবাই ভিন্ন কোনো ম্যাচ দেখছি? তিনি রোনালদোকে তুলে নিতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি যেন প্রকৃত ম্যানেজার নন। রোনালদো হয়তো শেষ পর্যন্ত গোল করতে পারত কিন্তু আজ (বৃহস্পতিবার রাত) ম্যাচ তাকে ছাড়িয়ে চলে গেছে।
ম্যাচের আগে সাবেক ক্লাব সতীর্থ ওয়েইন রুনি মজা করে বলেছিলেন, এমবাপে, হালান্ড ও মেসির সাফল্য দেখে রোনালদো ‘ভালো অর্থেই ক্ষেপে’ থাকবেন। রুনি বলেন, চ্যালেঞ্জই তাকে এগিয়ে নেয়। তার মানসিকতাই এমন যে সবকিছুই তার কাছে প্রতিযোগিতা।
বছরের পর বছর সে আর মেসি একে অন্যকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে। সে সেরা হতে চায় এবং এতে কোনো খারাপ কিছু নেই। সে চাইবে আজ দুই-তিনটি গোল করে দেখাতে যে সে এখনও সেই পর্যায়েই আছে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে জোয়াও নেভেসের গোলে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। পেদ্রো নেতোর দুর্দান্ত ক্রস থেকে হেডে গোল করেন পিএসজি মিডফিল্ডার। কিন্তু প্রথমার্ধের শেষে নিউক্যাসল ফরোয়ার্ড ইয়োয়ানে উইসা সমতায় ফেরান কঙ্গোকে। ৭৫ শতাংশ বল দখলে রেখেও পুরো ম্যাচে মাত্র সাতটি শট নিতে পারে পর্তুগাল। এর মধ্যে লক্ষ্যে ছিল মাত্র একটি, সেটিই গোল।
রোনালদোও পান দুটি সুযোগ। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও ডান দিক থেকে দুবার বল বাড়িয়ে দেন তাকে। প্রথম শটটি যায় পোস্টের বাইরে, দ্বিতীয় সুযোগে কঙ্গোর রক্ষণভাগের চাপে তার শটও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ফলে ২০২২ বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করা গোলের পর টানা ১০টি বড় টুর্নামেন্টের ম্যাচে গোলহীন থাকলেন তিনি।
আরেকটি পরিসংখ্যানও বলে দেয় তার প্রভাব কতটা সীমিত ছিল। পুরো ম্যাচে রোনালদোর বল স্পর্শ মাত্র ২৫ বার, যা পুরো ম্যাচ খেলা পর্তুগালের সব আউটফিল্ড ফুটবলারের মধ্যে সবচেয়ে কম। ম্যাচ শেষে রুনি বলেন, তার পরিসংখ্যান কখনোই খুব ভালো হবে না। তার যা দরকার, তা হলো সুযোগ। ভালো সুযোগ পেলে সে এখনও গোল করতে পারবে।
এদিকে গায়েল ক্লিশির মতে, রোনালদোর উপস্থিতি কখনো কখনো সতীর্থদের ওপর অচেতন প্রভাব ফেলে। সাবেক ফরাসি ডিফেন্ডার বলেন, আমরা বলেছিলাম, রোনালদো তরুণদের সাহায্য করবে। কিন্তু কখনো কখনো এমন বড় তারকারা অজান্তেই সব আলো নিজের দিকে টেনে নেয়। প্রথম সুযোগটিতে যদি সামনে অন্য কেউ থাকত, হয়তো কনসেইসাও নিজেই শট নিত।
একসময় যে রোনালদো একাই ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিতেন, সেই রোনালদো এখন ইতিহাসের পেছনে ছুটছেন। তার চোখ এখনও গোলের ক্ষুধায় জ্বলজ্বল করে কিন্তু সময় যেন শরীরের গতি ও প্রভাব ধীরে ধীরে গ্রাস করছে।
তবে গল্পটা বোধহয় এখানেই শেষ নয়। ম্যাচ শেষে সেই বার্তাটাই দিয়ে রাখলেন রোনালদো, শুরুটা আমাদের চাওয়ামতো হয়নি মোটেও, তবে সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি। মাথা উঁচু রাখছি, এখন পুরো মনোযোগ পরের ম্যাচে।
ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির নাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাকে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সাহস খুব কম মানুষেরই আছে। কারণ ফুটবল বহুবার দেখেছে, যখন সবাই তাকে শেষ ভেবে নিয়েছে, তখনই তিনি নতুন করে ফিরে এসে ইতিহাস লিখেছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও