হাত নেই, পা দিয়েই স্বপ্নপূরণ করলেন আয়েশা

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

জন্ম থেকেই নেই দুটি হাত। কিন্তু সেই শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই থামিয়ে রাখতে পারেনি তাঁর স্বপ্নকে। পা দিয়ে কলম ধরে লিখেছেন,

2026-06-19T14:34:11+00:00
2026-06-19T14:34:11+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
সারাদেশ
হাত নেই, পা দিয়েই স্বপ্নপূরণ করলেন আয়েশা
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ২:৩৪ পিএম 
পা দিয়েই স্বপ্নপূরণ করলেন আয়েশা। ছবি : সময়ের আলো
জন্ম থেকেই নেই দুটি হাত। কিন্তু সেই শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই থামিয়ে রাখতে পারেনি তাঁর স্বপ্নকে। পা দিয়ে কলম ধরে লিখেছেন, পড়েছেন, পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। একে একে এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি পেরিয়ে সম্প্রতি মাস্টার্সও সম্পন্ন করেছেন প্রথম বিভাগে। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের আয়েশা আক্তারের জীবনগল্প আজ সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ।

অথচ একসময় এই আয়েশাকেই সার্কাসে বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তাঁর বাবা। চরম দারিদ্র্য আর প্রতিবন্ধী মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা থেকেই এমন সিদ্ধান্তের কথা মাথায় এসেছিল তাঁর। কিন্তু আয়েশার দৃঢ় মনোবল বদলে দিয়েছে সেই ভাগ্যলিখন।

১৯৯৩ সালে সাঘাটা উপজেলার পূর্ব কচুয়া গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আয়েশা। জন্মগতভাবে দুটি হাত না থাকায় শুরু থেকেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান বাবা আব্দুল লতিফ ও মা ফাতেমা বেগম। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বাঁচতে হবে— এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে বিভিন্ন কাজ শেখার চেষ্টা শুরু করেন তিনি।


ধীরে ধীরে পা দিয়েই আয়ত্ত করেন লেখা, কাঁথা সেলাই, রান্না, গোসল, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ব্যবহারসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজ। বর্তমানে এসব কাজ তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই করতে পারেন।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবারের আর্থিক সংকট চরমে পৌঁছায়। সেই সময়ে মেয়েকে সার্কাসে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার বাবা। তবে আয়েশা নিজের স্বপ্ন ও শিক্ষার প্রতি অটুট বিশ্বাস নিয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পড়ালেখাই হবে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ— এই বিশ্বাসই তাকে নতুন করে সাহস জোগায়।

পা দিয়ে লিখেই এসএসসি ও এইচএসসি— উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। এরপর সাঘাটা উপজেলার উদয়ন মহিলা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। সম্প্রতি গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেছেন এবং সেখানেও পেয়েছেন প্রথম বিভাগ।

উদয়ন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা আয়েশার পড়াশোনার জন্য সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। তার সাফল্য শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্যই গর্বের নয়, সমাজের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা।’

বর্তমানে মাস্টার্স শেষ করে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন আয়েশা। পাশাপাশি বিনা পারিশ্রমিকে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াচ্ছেন। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের অন্য সদস্যরা কেউ পড়াশোনা করছে, কেউ আবার বাবার ছোট ব্যবসায় সহায়তা করছে।

দুটি টিনের দোচালা ঘরই তাদের পরিবারের একমাত্র সম্বল। একটিতে ভাইবোনদের নিয়ে থাকেন আয়েশা, অন্যটিতে বসবাস করেন তার বাবা-মা।

আয়েশা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সমাজের অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চেয়েছি। পড়াশোনার মাধ্যমে অনেকটাই সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি। এখন আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একটি সরকারি চাকরি, যাতে বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে সহযোগিতা করতে পারি।’

বাবা আব্দুল লতিফ ও মা ফাতেমা বেগম জানান, ছোটবেলা থেকেই নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে তাদের মেয়ে। তাদের একমাত্র চাওয়া ছিল, আয়েশা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। আজ মেয়ের সাফল্যে তারা গর্বিত।

দুই হাত ছাড়া জন্ম নেওয়া আয়েশা আজ নিজের এলাকায় অনুপ্রেরণার প্রতীক। শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নানা বাধা পেরিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন— ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো সীমাবদ্ধতাই মানুষের অগ্রযাত্রা থামাতে পারে না। তবে আর্থিক সংকট এখনও তার পথচলার বড় বাধা হয়ে আছে।


এলাকাবাসীর দাবি, মেধাবী ও সংগ্রামী এই তরুণীকে একটি সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হলে তাঁর দীর্ঘ লড়াই পূর্ণতা পাবে।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ইমাম হাছিম বলেন,
‘আয়েশার সাহসিকতা ও সাফল্য অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

আয়েশার জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’। প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনায় নির্মিত এই তথ্যচিত্রের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেছেন চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোস্তফা মল্লিক।

দুটি হাত না থাকলেও জীবন যে থেমে থাকে না, আয়েশা আক্তার তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। এখন শুধু অপেক্ষা একটি কর্মসংস্থানের— যা তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম ও অর্জনের গল্পকে দেবে নতুন এক পূর্ণতা।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   হাত-পা  স্বপ্নপূরণ  আয়েশা  রংপুর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: