কখনও চিঠি পোস্ট করতে, কখনও সঞ্চয়পত্র বা অন্যান্য ডাক বিভাগের সেবা নিতে পোস্ট অফিসে যেতে হয়। কিন্তু সেখানে যেতে হলে যদি হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে বা নৌকায় চড়ে যেতে হয়- তাহলে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। অথচ এমনই বাস্তব চিত্র ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের ধলা বাজার সাব-পোস্ট অফিসের।
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই সাব-পোস্ট অফিসটি জলাবদ্ধতার মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ভবনের চারপাশ পানিতে তলিয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে অফিসে প্রবেশ করাই দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে ডাক বিভাগের বিভিন্ন সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পোস্ট অফিসের চারপাশের নিচু জায়গা ও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থা বিরাজ করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, দ্রুত জায়গাটি ভরাট করে উঁচু করা অথবা পোস্ট অফিসটি উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা না হলে ভোগান্তি আরও বাড়বে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ধলা বাজার সাব-পোস্ট অফিসটি যেন একটি পুকুরের মাঝখানে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। চারদিকে থইথই পানি, মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি। সেখানে পৌঁছাতে হলে জুতা খুলে হাতে নিয়ে ইটের স্লাবের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। পানি আরও বেড়ে গেলে একমাত্র ভরসা নৌকা। অথচ পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
শুধু পোস্ট অফিসই নয়, এর সামনের সড়কের অবস্থাও অত্যন্ত বেহাল। সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে হাঁটুসমান গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে স্থায়ীভাবে পানি জমে থাকে। ফলে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, পথচারীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের পাশেই রয়েছে শতবর্ষী একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং একটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা এই পথ ব্যবহার করলেও দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির সংস্কার বা জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জনদুর্ভোগ দিন দিন আরও বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন, বুলবুল আহমেদ ও ইফতিখার আহমেদ বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই এই অফিসকে এমন অবস্থায় দেখে আসছি। সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা। এই পোস্ট অফিসের মাধ্যমে কয়েকটি ইউনিয়নের চিঠিপত্র ও বিভিন্ন ডাকসামগ্রী আসে। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে সেগুলো অফিসে রাখা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে সামনের মাছের হ্যাচারিতে রেখে পরে বিতরণ করতে হয়।’
সাব-পোস্ট অফিসের এক কর্মচারী বলেন, ‘আমি গত ২৫ বছর ধরে এখানে কর্মরত আছি। এই পুরো সময়জুড়ে বর্ষা এলেই পোস্ট অফিসে হাঁটুসমান পানি জমতে দেখেছি। শুধু অফিসের চারপাশই নয়, অনেক সময় অফিসের ভেতরেও হাঁটুসমান পানি উঠে যায়। এতে স্বাভাবিকভাবে দাফতরিক কাজ পরিচালনা করতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট দফতরের লোকজন এসে পরিদর্শন করেছেন, মাপজোক করে গেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। অথচ ধলা বাজার এলাকা মাছের হ্যাচারির জন্য সারা দেশে পরিচিত। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে পোস্ট অফিস ও সামনের সড়কের এই বেহাল অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক।’
সাব-পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার মো. আবু তাহের বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে প্রথমেই জমে থাকা পানি সেচে বের করতে হয়। কয়েকদিন আগে পানিতে পিছলে পড়ে আহতও হয়েছি। প্রতিদিনই গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পানিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে। অফিসে পানি থাকায় পার্সেলগুলো পাশের একটি মাছের হ্যাচারিতে রেখে সেখান থেকেই বিতরণ করতে হচ্ছে। যোগদানের পর থেকেই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠি ও ভিডিও পাঠিয়ে জানিয়েছি। তারা দ্রুত দ্বিতল ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এজন্য কর্মকর্তারাও সরেজমিনে এসেছিলেন। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি শুনছি, আবার ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমাদের বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।’
এ বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সময়ের আলো/মহু