ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনের পুকুর যেন সোনার খনি। এই পুকুর গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে খরচ করা হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।
পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের (ইউএনও) বাসভবনের দেয়াল ঘেঁষে সরকারি পুকুর এবং অন্যপাশে ইউএনওর বাসভবনের সীমানা প্রাচীর। মাঝখানে অর্ধশত বছরের পুরোনো আহাম্মদ সরকার নামে একটি সড়ক রয়েছে। সড়কটির দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণ এই সড়ক ব্যবহার করে আসছেন।
জানা গেছে, আহাম্মদ সরকার সড়কটি বছর দুয়েক আগেই প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনঃসংস্কার করা হয়েছিল। তবে সম্প্রতি নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়কটির বিদ্যমান গতিপথ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন ইউএনও আরাফাত সিদ্দিকি। এ কাজের জন্য পৌরসভা থেকে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ সম্প্রতি সংস্কার করা একটি সড়কের গতিপথ পরিবর্তনে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি এই পুকুরটি একটি ‘সোনার খনি’তে পরিণত হয়েছে। তাদের দাবি, নতুন কোনো ইউএনও দায়িত্ব গ্রহণ করলেই পুকুর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং এসব প্রকল্পের বিপরীতে লক্ষ লক্ষ টাকার বরাদ্দ নেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে পুকুরটির গাইড ওয়াল নির্মাণ, সংলগ্ন রাস্তার সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন, আলোকসজ্জা, বসার স্থান ও টাইলস স্থাপন, এমনকি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে পৌরসভা ও সরকারি কোষাগার থেকে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের এই ব্যয়ের সুফল ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
পৌরসভার প্রকৌশলী দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘কোভিড-১৯’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পুকুরটিতে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৬২৩ টাকা ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি থেকে পুকুরের পাড়ে নতুন লাইট স্থাপনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৮২৭ টাকা। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপির পুকুরের একপাশ ভরাট করে সড়কের গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৫২ টাকার একটি প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়াও এ পুকুরে এর আগেও বিভিন্ন অর্থ বছরে বরাদ্দের কাজ দেখানো হয়েছে।
পৌরসভার বাইরে সরকারি কোষাগার থেকে এ পুকুরের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো প্রকল্পই স্থায়ীভাবে আলোর মুখ দেখেনি বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুয়েল আহমেদের উদ্যোগে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে পুকুরটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় পুকুরটি গভীর খনন করা হয় এবং বিভিন্ন আধুনিক ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। পরে বিভাগীয় কমিশনারকে দিয়ে প্রকল্পটির উদ্বোধনও করানো হয়। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে দাবি করা হয়, এআই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব হবে।
জাঁকজমকভাবে উদ্বোধন হলেও প্রকল্পটি বেশিদিন টেকেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প চালুর ছয় মাসের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইউএনও বদলি হয়ে গেলে মাছ চাষ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। পরে জানা যায়, পুকুর খননকাজের ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া বিশ্বাস ফিশ ফিড থেকে আনা মাছের খাদ্যের মূল্যও বকেয়া রয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও কোনো পদক্ষেপ নিতে অপারগতার কথা জানান বলেও রয়েছে অভিযোগ। পরবর্তীতে পাওনা আদায়ের অংশ হিসেবে পুকুরের মাছ তুলে বিক্রি করে দেয় বিশ্বাস ফিশ ফিড কর্তৃপক্ষ। এদিকে প্রকল্পে ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তির যন্ত্রপাতিগুলোও বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়েছে। সেগুলোর অবস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
পুকুর খননের ঠিকাদার খাইরুল ইসলাম বলেন, পুকুর খনন বাবদ আমার ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার বিল হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত একটি টাকাও পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান ইউএনও আরাফাত সিদ্দিকী স্যারের কাছে বিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের ইউএনও কাজ করিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। অথচ এই প্রকল্পের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন হয়েছে। আমার প্রশ্ন, পুকুর খননের বিলের টাকা গেল কোথায়?
তিনি আরও বলেন, খননকৃত মাটি থানা চত্বরের পুকুর ও মসজিদের জায়গা ভরাটে ব্যবহার করা হয়েছে। সাবেক ইউএনও জুয়েল স্যার এ কাজের কোনো টেন্ডার দেননি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ইউএনওর কাজ হওয়ায় টেন্ডারের প্রয়োজন নেই। বিলের বিষয়ে জানতে একাধিকবার তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বিল পরিশোধ না হওয়ায় তিনি বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এআই প্রযুক্তি-সংক্রান্ত কাজের ঠিকাদার হেদায়েত উল্লাহ ফুরাত বলেন, সাবেক ইউএনও জুয়েল আহমেদ আমাকে ডেকে এআই প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ প্রকল্পের শেডঘর নির্মাণ, স্যানিটারি, বৈদ্যুতিক কাজ এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহের দায়িত্ব দেন। এসব কাজ কোনো টেন্ডার ছাড়াই আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি প্রায় ১৩ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন করি। সাবেক ইউএনও বদলি হয়ে চলে যাওয়ার পর অনেক ঘোরাঘুরির পর পরবর্তী ইউএনও বাকীউল বারী স্যার আমাকে ৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকার একটি বিল পরিশোধ করেন। তবে এখনও প্রায় ৫ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমান ইউএনও আরফাত সিদ্দিকী স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আগের ইউএনও চলে গেছেন, এখন আমি কী করব? এ কাজের বিষয়ে এসিল্যান্ড মাহবুবুর রহমান এবং পৌর প্রকৌশলী প্রদীপ কুমারও অবগত আছেন।
বিশ্বাস ফিশ ফিডের ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন বলেন, এটি একটি গবেষণামূলক প্রকল্প ছিল। তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মাছ ও মাছের খাবার সরবরাহ করা হয়েছিল এবং মাছ বিক্রির অর্থ তারা গ্রহণ করবে। পুকুরটি উপজেলা প্রশাসনের হলেও পুকুর ব্যবহারের বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলাদা কোনো চুক্তি ছিল না।
তিনি দাবি করেন, প্রকল্পটিতে তার প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে মাছ বিক্রি করে তিনি মাত্র আড়াই লাখ টাকা পেয়েছেন। নতুন ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে ডেকে এনে আটক করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, পুকুরের পাশের সড়কের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় সেটি মেরামতের জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়। পরে মুচলেকা দিয়ে সড়কটি সংস্কার করার অঙ্গীকার করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি নিজ খরচে সড়ক মেরামতের কাজ করছেন এবং এ পর্যন্ত এ কাজে ৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে জানান।
স্থানীয়দের মতে, এ আই প্রযুক্তির মাছ চাষে পুকুর অতিরিক্ত গভীরভাবে খনন করায় পাশের পৌরসভার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কের একটি অংশ পুকুরের দিকে হেলে পড়েছে। এই সুযোগে ইউএনও নতুন করে এই সড়কের গতিপথ পরিবর্তনে পায়তারা করছেন। এ নিয়ে এলাকার সাধারন মানুষ ফুসে উঠেছেন। তারা কোন ভাবেই পুরনো সড়ক পরিবর্তন করতে দিবেননা। তারা এলাকার মানুষদের জমায়েত করে বিক্ষোভ ও গনস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেছেন।
স্থানীয় ফারুক আহমেদ, আবু রায়হান বলেন, এই পুকুর ঘিরে নতুন নতুন ইউএনও নানা প্রকল্প আনেও। আমরা ছোট বেলা এই পুকুরে সাতার কাটতাম এখন কি মাছ চাষ করে তা বন্ধ করেছে। সড়ক নতুন করে পাকা হলেও পুকুর খনন করায় সড়ক হেলে পড়েছে এতে ইউএনওর মজা হয়েছে। নতুন প্রকল্প এনে খরচ করবে। পৌরসভার কত সড়ক আছে হেটে চলা যায়না তা সংস্কার করেনা। এই পুকুরে কি দেখেছে এখানে সরকারী অর্থের অপচয় করে।
স্থানীয় জাবাদুল হক খান বলেন, এই পুকুর যেন সোনার হরিণ। গত ইউএনও মাছ চাষ প্রকল্প দেখিয়ে এক কোটি টাকার উপরে খরচ করেছে। কোন ফায়দা হয়নি। এইটা আরও আমাদের জন্য দুর্ভোগ হয়েছে। খনন করার ফলেই হেলে পড়েছে, প্রয়োজন ছিল না খননের। এখানে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন প্রকল্প দ্বারা সরকারি অর্থ খরচ করা হয়েছে। কিছুদিন আগে ইউএনওর বাসায় কিছু কাজ হয়েছে। কয়েক লক্ষ টাকার কাজ হয়েছে, যেগুলোর নাকি কোনো টেন্ডারই নাই। এখন শুনছি ওইগুলোর টেন্ডার হবে। কাজ হওয়ার পর টেন্ডার হয় কিভাবে? আমি বলবো, এই সড়ক যাতে কোনোভাবেই বন্ধ না হয়।
ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি স্থানীয় বাসিন্দা ফয়েজ উদ্দিন সরকার বলেন, এ রাস্তা বন্ধ কইরা দিয়া কেইল্লেগ্যা (কী কারণে) আরেকটা রাস্তা করুইন (করা) লাগে, কেইল্যাগ্যা (কী কারণে) সরকারি টেহা (টাকা) অপচয় করুইন (করা) লাগে? রাস্তা সংলগ্ন দীঘি খনন কইরা অর্থ আত্মসাৎ করছে। পৌরসভার কত রাস্তা আছে মানুষ আটতে পারেনা, ওই গুলা ঠিক করতে পারেনা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকি বলেন, পুকুরটি আমার সরকারি বাসভবনের পাশে হওয়ায় বিষয়টি আমার নজরে আসে। জানতে পেরেছি, ২০২৪ সালে সাবেক ইউএনও সারাদেশে মডেল হিসেবে এআই পদ্ধতিতে এ পুকুরে মাছ চাষ প্রকল্প শুরু করেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর একদিন আমি লক্ষ্য করি, পুকুরে মাছ, পানি কিংবা প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কোনো যন্ত্রপাতি নেই। এগুলো কে বা কারা সরিয়ে নিয়েছে, সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। মাছ চাষ প্রকল্পের আওতায় পুকুরটি গভীরভাবে খনন করায় পাশের সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে রাস্তা হেলে পড়ে। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ফিডকে ডেকে এনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়। আমি আসার পর এ পুকুরের জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে কোনো বরাদ্দ গ্রহণ করিনি।
তিনি আরও বলেন, আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সড়কটির পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ভারী যানবাহন ও দ্রুতগতির গাড়ি চলাচলের কারণে সেখানে নানা সমস্যা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এছাড়া সড়কটির পাশে উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবন অবস্থিত থাকায় নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এসব কারণেই সড়কটির নকশা ও চলাচল ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সময়ের আলো/আতা