গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক স্থানীয় নেতা খুন হওয়ার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এলাকায়। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হলেও মূল অভিযুক্তসহ বাকিরা এখনো পলাতক।
রোববার (২১ জুন) বিকেলে বোনারপাড়া বাজারের চারমাথা চত্বরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম সাইফুল্লাহ বারী (২৪)। তিনি বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন এবং রংপুরের সাতগড়া মডেল কামিল মাদরাসার আল কুরআন বিভাগে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন। তার বাবার নাম হবিবার রহমান মওলানা, বাড়ি একই ইউনিয়নের শিমুলতাইর গোরস্থানপাড়া গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিপক্ষের লোকজন লোহার শাবল দিয়ে সাইফুল্লাহ বারীর গলায় সজোরে আঘাত করে, যা একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। একই সময় তার বন্ধু সালাউদ্দিনকেও ছুরিকাঘাত করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গুরুতর আহত সাইফুল্লাহ বারীকে স্বজনেরা উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে আহত সালাউদ্দিনকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। ফুটানি বাজার এলাকার দুদু মিয়ার ছেলে সালাউদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী বলে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় জামায়াত-শিবির একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে, যাতে যোগ দেন নিহতের স্বজন ও এলাকার ক্ষুব্ধ বাসিন্দারাও। মিছিল থেকে একপর্যায়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং ভাঙচুরের পাশাপাশি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
বোনারপাড়া ইউনিয়নের বাটি গ্রামে অভিযুক্ত মোকলেছুর রহমান মুকুল ও তার ভাই পলাশের বাড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগানো হয় বলে নিশ্চিত করেছে বোনারপাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। খবর পেয়ে সাঘাটা ফায়ার সার্ভিসের ২২ সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত পৌনে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
সাঘাটা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন অফিসার তোফাজ্জাল হোসেন জানান, আগুনে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকার সম্পদ পুড়ে নষ্ট হয়েছে। তবে দ্রুত পদক্ষেপের কারণে প্রায় ১৫ লাখ টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি জানান।
মুকুল ও পলাশ সম্পর্কে আপন দুই ভাই এবং বাটি গ্রামের জাহিদুল ইসলামের ছেলে। তাদের মধ্যে মুকুল বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে একই গ্রামের আকবর খন্দকারের ছেলে আশরাফ খন্দকারকে (৩৬) আটক করেছে পুলিশ।
সাঘাটা থানার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পবিত্র কুমার জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আশরাফ নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছেন এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে রাত ৯টার দিকে বিক্ষোভ করে গাইবান্ধা জেলা ইসলামী ছাত্রশিবির। বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে তারা গাইবান্ধা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। একই ইস্যুতে পলাশবাড়ী উপজেলা, রংপুর শহর ও ঢাকাতেও বিক্ষোভ করেছে ছাত্রশিবির। সংগঠনটি আগামীকাল ২২ জুন সকাল ১১টায় গাইবান্ধা পৌরপার্ক থেকে আরেকটি বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জাতীয় সংসদের অধিবেশন শেষে সংসদ ভবন চত্বরে সংবাদ সম্মেলন করেন গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ। তিনি ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানান। এ সময় গাইবান্ধার জামায়াত-সমর্থিত অন্য সংসদ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক শোকবার্তায় গভীর শোক, ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি ঘটনাকে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে এর সঙ্গে জড়িত বিএনপির সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ এভাবে প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গড়াবে, তা কেউ ভাবতে পারেননি। এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সময়ের আলো/জোই