রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় গত ২০ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে সাদুল্লাপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিনকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় বদলি করে। একই আদেশে কাউনিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পালকে সাদুল্লাপুরে পদায়ন করা হয়। প্রজ্ঞাপনে জনস্বার্থে আদেশটি অবিলম্বে কার্যকরের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, অথচ জসিম উদ্দিন নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত ২৪ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আলাদা এক প্রজ্ঞাপনে তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পান। ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাদুল্লাপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেন। দায়িত্বকালে তিনি পার্শ্ববর্তী সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত এসিল্যান্ডের দায়িত্বও পালন করেন। বদলির পরও কেন তিনি কর্মস্থল ছাড়েননি- এই প্রশ্ন এখন স্থানীয় মহলে আলোচনার কেন্দ্রে।
সাম্প্রতিককালে ধাপেরহাট ইউনিয়নের হাসানপাড়া মৌজায় সরকারের ১/১ খতিয়ানের অর্পিত ‘ক’ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি- অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে। এই একই সম্পত্তি নিয়ে ভূমি প্রশাসনের দুটি পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কীভাবে সরকারি নথিতে দুটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে- তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া সাদুল্লাপুর মৌজার জেএল নং-৪১-এর বিআরএস ১ নং খতিয়ানভুক্ত ৫৮৯ নং দাগের সরকারি খাস জমি ও মূল্যবান মেহগনি গাছ সংরক্ষণে জসিম উদ্দিনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি রেকর্ড ও গেজেটভুক্ত নকশায় জমিটির অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত থাকলেও গত ২৩ এপ্রিল সরেজমিন পরিদর্শনে তিনি মন্তব্য করেন, জমিটি শনাক্ত করা সম্ভব নয়- এটি ‘রাস্তায় মিশে গেছে’ বা ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’। অথচ তহশিলদার কার্যালয়ের স্মারক নং-৩০০ ও ৩১১-এর নোটিশে একই জমিতে সরকারি স্বার্থ ও গাছ থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জামুডাঙ্গা মৌজার জেএল নং-২২-এর বিআরএস ২৯৬ ও ১৪৪২ খতিয়ানভুক্ত জমি খাস হিসেবে চিহ্নিতকরণের ঘটনায় কামরুজ্জামান মণ্ডল নামে একজন লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রকৃত মালিক ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথভাবে না জানিয়েই লাল নিশানা ও সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়, যা এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি সরকারি ১ নং খতিয়ান, ১/১ খতিয়ান ও ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি ব্যক্তিগত নামে নামজারির অভিযোগও রয়েছে।
অর্পিত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ ইস্যুতে বক্তব্য ও তথ্য জানতে গত ১৮ জুন সাদুল্লাপুর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে যান যমুনা টেলিভিশনের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জিল্লুর রহমান পলাশ এবং সময় টেলিভিশনের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু। সাংবাদিকদের অভিযোগ, এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ও অপেশাদার আচরণ করেন। তাদের বুম ও ক্যামেরা সরিয়ে দিয়ে কার্যালয় ছেড়ে যেতে বলেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।
গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর বিভাগীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে গত রোববার গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে তদন্ত পরিচালনা করেন রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আশরাফুল ইসলাম। তদন্তে সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য নেওয়া হয় এবং ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার নথি, রেকর্ড ও দলিলপত্র বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে ঘটনার বিভিন্ন দিক এখন আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক পর্যালোচনার আওতায় এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে জসিম উদ্দিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ভূমি সেবা প্রত্যাশীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি খাস জমি সংরক্ষণ, নামজারি কার্যক্রম, এবং ভূমি প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এর পাশাপাশি সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গে অমার্জিত আচরণ, হয়রানি এবং একটি বিশেষ পক্ষকে অনুচিত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়া প্রশাসনের জবাবদিহিতার ঘাটতির একটি দৃষ্টান্ত। তাঁদের দাবি, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং বদলির আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা ছাড়া ভূমি প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে মো. জসিম উদ্দিনের মন্তব্য পাওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সময়ের আলো/আতা