জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো প্রবাদ বাক্যের বাস্তব প্রতিচ্ছবি যেন দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার চরকাই গ্রামের আফসানা পারভীন। জন্মের মাত্র চার মাস পর পিতাকে এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে মাকেও হারিয়ে এতিমখানায় বেড়ে ওঠা এই নারী আজ নিজ গ্রামের শত শত শিশুর মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
বিরামপুর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মোশাররত জাহান বলেন, আফসানা পারভীন আমাদের সমাজের নারীদের জন্য এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের শুরুতে চরম প্রতিকূলতা ও অভিভাবকহীনতার মুখোমুখি হয়েও তিনি যেভাবে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন এবং শত শত শিশুর মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি কর্মের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
একজন এতিম শিশু থেকে আজ তিনি নিজে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সমাজকে আলোকিত করেছেন। তার এই সংগ্রামী জীবন ও সাফল্য আমাদের উপজেলার তথা সারা দেশের নারীদের যেকোনো বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে। মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের পক্ষ থেকে তার এই মহতী উদ্যোগ ও সমাজসেবামূলক কাজকে আমরা সাধুবাদ জানাই এবং তার এই লড়াইকে স্যালুট জানাই।
আফসানা পারভীনের জন্ম ১৯৮৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বিরামপুর উপজেলার চরকাই গ্রামে। তার বাবা আহসান জলিল ও মা ফাতেমা বেগম দুজনই মৃত্যুবরণ করেন যখন তিনি ছিলেন একেবারেই ছোট্ট শিশু। পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে তিন ভাইবোনকে আশ্রয় নিতে হয় রাজশাহীর এসওএস শিশুপল্লীতে। সেখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন। সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান।
লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি এবং মাদারবক্স গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আফসানা উপলব্ধি করেন, শিক্ষাই পারে সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে। তার নিজ গ্রাম চরকাইয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শিশুদের কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হতো। ফলে অনেক শিশুই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০১০ সালে গ্রামের কয়েকজন শিক্ষিত নারী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি। নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে জমি ক্রয় করেন এবং সহকর্মী মুর্শিদা আক্তার ও হানিফা খাতুনের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমদিকে টিনশেড ঘরে শুরু হওয়া বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে এলাকাবাসীর আস্থা অর্জন করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলার পর ২০১৪ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের আওতাভুক্ত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন এবং শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষালাভ করছে।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষার্থীদের সাফল্যও উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও বৃত্তি পরীক্ষায় প্রতি বছরই শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে আসছে। তার প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কেউ নৌবাহিনীতে, কেউ সেনাবাহিনীতে এবং কেউ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত।
আফসানা পারভীন বলেন, আমার শৈশব ছিল অনেক কষ্টের। তাই শিশুদের কষ্ট আমি বুঝি। তাদের মুখে হাসি দেখতে পারলেই আমার জীবনের সব কষ্ট ভুলে যাই। আমার শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে এবং ছুটিতে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে, তখন মনে হয় আমার জীবনের সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।
স্থানীয়রা মনে করেন, আফসানা পারভীনের জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষা বিস্তারে অবদান বর্তমান সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। একজন এতিম শিশুর এমন সাফল্য প্রমাণ করে যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম এবং মানবসেবার মানসিকতা থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. অফিফা খাতুন বলেন, আফসানা পারভীনের জীবন আমাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার গল্প। ছোটবেলায় এত কষ্ট সহ্য করেও তিনি নিজের জন্য শুধু ভালো কিছু করেননি, গ্রামের শিশুদের শিক্ষার জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এই অবদান চরকাইবাসী কখনো ভুলবে না।
বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. ইস্মোতারা বেগম বলেন, আগে আমাদের গ্রামের ছোট ছোট শিশুদের দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হতো। অনেক পরিবার দূরত্বের কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে অনীহা দেখাত। আফসানা আপার উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন গ্রামের শিশুরা সহজেই শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করেন।
সময়রে আলো/আআ