চট্টগ্রামে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতারের ১৯ ঘণ্টার মধ্যে নুরুল আলম (৩৫) নামে যুবলীগের এক নেতা মারা গেছেন হাসপাতালে। বুধবার সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। সাতকানিয়া থানা পুলিশ বলছে, ডিবি পুলিশ গ্রেফতারের পর থানায় হস্তান্তরের সময় সুস্থ ছিলেন নুরুল আলম। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে মৃত্যু হয়েছে তার।
নুরুল আলম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের উত্তর ঢেমশা গ্রামের মৃত এবার হোসেনের ছেলে। তিনি ঢেমশা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। চট্টগ্রাম নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজারের তামাকুমন্ডি লেনের বিনিময় টাওয়ারে ‘বিগ বস’ নামে তার একটি দোকান আছে।
চট্টগ্রাম জেলা কারাগার সূত্র জানায়, সাতকানিয়া থানার মামলায় হাজতি পরোয়ানার ভিত্তিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে কারাগারে নিয়ে আসা হয়। ছিলেন চার নম্বর সূর্যসেন ওয়ার্ডে। বুধবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে বন্দি গণনার সময় অসুস্থবোধ করছেন বলে জেলারকে জানান তিনি। এরপর তাকে কারা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর সকাল ৭টা ৩১ মিনিটে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। চমেকের জরুরি বিভাগে পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক ৭টা ৫০ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, নুরুল আলম অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। তিনি শ্বাসকষ্টে নাকি ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন তা ডাক্তাররা ভালো বলতে পারবেন। তবে এত দ্রুত মারা গেলে মনে করা হয় হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে।
কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ শরীফ বলেন, নুরুল আলমকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। বুধবার সকালে তিনি অসুস্থবোধ করেন। তাকে চমেকে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে সাতকানিয়ার ঢেমশার নিজ বাড়ি থেকে নুরুল আলমকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম। পরে তাকে সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়। থানা থেকে পুলিশ তাকে জুলাই আন্দোলনের সময় হামলা, মারধর, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনের এক মামলায় গেস্খফতার দেখিয়ে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করে।
পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। পুলিশ যে মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে ওই মামলার এজাহারে তার নাম নেই। অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের মধ্যে তদন্তে প্রাপ্ত দেখিয়ে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। গেল ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সন্ত্রাস-নাশকতা রুখতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সাতকানিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নুরুল আলমের বিরুদ্ধে থানায় আগের কোনো মামলার রেকর্ড নেই। মঙ্গলবার ডিবির টিম তাকে গ্রেফতার করে থানায় হস্তান্তর করে। আমরা একটা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছিলাম। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে জেনেছি কারাগারে অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, গ্রেফতারের সময় তিনি সুস্থ ছিলেন। বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে থানায় দেওয়ার সময় সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। এ সংক্রান্ত ছবি-ভিডিও আমাদের কাছে আছে। আদালতে সুস্থ অবস্থায় হাস্যোজ্জ্বলভাবে তিনি ছবি তোলেন। তার পরিবারের লোকজন ফেসবুকে এসব ছবি পোস্ট করেছেন। পরে শুনেছি তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।
এদিকে নুরুল আলমের বড় ভাই নূর মোহাম্মদ অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় কিছু লোকের সঙ্গে জমি নিয়ে তাদের বিরোধ আছে। মঙ্গলবার সাতকানিয়া ভূমি অফিসে ওই জমি নিয়ে শুনানি হয় এবং শুনানিতে অংশ নিতে এলাকায় এসেছিলেন নুরুল আলম। সেখান থেকে তাকে ডিবি পুলিশ আটক করে সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করেছে।
তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের নামে কোনো মামলা ছিল না। জমির বিরোধে তাকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
গ্রেফতারের বর্ণনা দিয়ে নূর মোহাম্মদ বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে সাতকানিয়া থানার সামনে থেকে আমার ভাইকে ডিবি পুলিশ আটক করে। এরপর দ্রুত আদালতে পাঠানো হয়। সন্ধ্যায় কারাগারে নেওয়ার সময়ও সে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। কোনো অসুস্থতার কথা বলেনি।
তিনি আরও বলেন, আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না। আমরা মনে করি, নুরুল আলমের মৃত্যুর ঘটনা খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
এলাকার লোকজন জানান, রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রাজনীতির বাইরে ছিলেন। ব্যবসা এবং পারিবারিক বিষয় নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতেন। তামাকুমন্ডি লেনের দোকান দেখাশোনা করতেন।
সময়ের আলো/আআ