যমুনা, হুড়াসাগর ও ইছামতী নদীবেষ্টিত পাবনার বেড়া উপজেলার চরাঞ্চলের প্রায় আটটি গ্রামের অন্তত এক হাজার শিক্ষার্থীর যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। নানা প্রতিকূলতা ও জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে প্রতিদিন তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করলেও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাহীনতা তাদের শিক্ষাজীবনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিভাবকরা সর্বস্ব ব্যয় করে সন্তানদের শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখলেও যাতায়াতের দুর্ভোগ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সেই স্বপ্ন অনেক ক্ষেত্রেই ভেঙে যাচ্ছে। ফলে উপজেলার চর নাগদাহ, চর সাঁড়াশিয়া, চর সাফুল্লাহ, চর পাইখন্দ, চর নাকালিয়া ও হাটাইল-আঁড়ালিয়া এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
চরাঞ্চলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে যমুনা, হুড়াসাগর ও ইছামতী নদী পাড়ি দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। অদম্য সাহস ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তারা প্রতিদিন যাতায়াত করলেও অনিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা তাদের শিক্ষার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাকালিয়া আনোয়ারা কাদের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থী নিয়মিত আমাদের বিদ্যালয়ে আসে। তাদের লেখাপড়ার মানও ভালো। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে তারা আরও মনোযোগী ও অগ্রসর হতে পারবে।’
চর নাগদাহ গ্রামের স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহিদ মোল্লা জানান, চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। তার ওয়ার্ডের প্রায় দুই থেকে আড়াইশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন নদী পার হয়ে নাকালিয়া এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। কোনোদিন নৌকা বা ঘোড়ার গাড়ি সময়মতো না এলে অনেক শিক্ষার্থী সেদিন বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে তারা নিরাপদে বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।’
চর নাকালিয়া গ্রামের শিক্ষক ইসমাইল মাস্টার বলেন, ‘দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর মাধ্যমিকে ভর্তি হতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। নদী পারাপারের ঝামেলা এবং অনিশ্চয়তার কারণে অভিভাবকরাও অনেক সময় সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি উৎসাহ হারান।’
তিনি আরও জানান, নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে অনেক ছাত্রীকে বালু ও কাদামাটি মাড়িয়ে চলতে হয়। মাঝে মাঝে কিছু বখাটে যুবকের উত্যক্ত করার ঘটনাও ঘটে। এতে অনেক ছাত্রী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে ভয় পায়। সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তার চিন্তায় অনেক অভিভাবক অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বেড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সোলাইমান হোসেন বলেন, ‘চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অকালে ঝরে পড়ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার জানা মতে, উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা পর্যায়ের প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে।’
চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
সময়ের আলো/এসএকে