এক সময় বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব মনে করা হলেও, সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন নাটোরের এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। আধুনিক প্রযুক্তি, পলি নেট হাউজ এবং উন্নত পরিচর্যা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি বিভিন্ন জাতের সুমিষ্ট আঙুর বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে এলাকায় রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন তিনি। তার এই সফলতা দেখে এখন স্থানীয় অন্য কৃষকদের মাঝেও আঙুর চাষের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
মাচার নিচে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে সাদা, কালো, সবুজ, লাল ও বেগুনি রঙের থোকা থোকা আঙুর। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে পাকা টসটসে ফল। কোনোটি একদম মিষ্টি, আবার কোনোটি হালকা টক-মিষ্টি। দৃষ্টিনন্দন এই বাগানটি দেখলে যে কারও মনে হবে—এ যেন বিদেশের কোনো আঙুর খেত!
এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন নাটোর সদর উপজেলার হালসা ইউনিয়নের বাগরুম গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন। দশ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আমজাদ পড়াশোনায় মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে না পারলেও দমে যাননি। ২০১৮ সালে ইউটিউব এবং ফেসবুক দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে শখের বশে মাত্র ৫ শতক জমিতে আঙুর চাষ শুরু করেন।
প্রাথমিক সফলতার পর তিনি বাণিজ্যিক পরিধি বাড়ান। বর্তমানে নাটোর শহরতলির কান্দিভিটা এলাকায় প্রায় দেড় বিঘা জমিতে রাশিয়ান 'বাইকুনুর'সহ প্রায় সাতটি উন্নত বিদেশি জাতের আঙুর চাষ করছেন তিনি।
আমজাদ হোসেন জানান, প্রথম প্রথম চাষটা কঠিন মনে হলেও আসলে এটি বেশ সহজ। আমরা বাড়ির আঙিনায় যেভাবে জৈব সার দিয়ে লাউ-কুমড়ো চাষ করি, ঠিক একইভাবে সঠিক নিয়মে পরিচর্যা করলে আঙুর গাছও টিকিয়ে রাখা সম্ভব। স বর্তমানে বাগান থেকে শুধু ফল বিক্রিই নয়, বরং আঙুরের কাটিং চারা তৈরি করেও তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় করছেন। ইতোমধ্যে তিনি লক্ষাধিক টাকার চারা বিক্রি করেছেন বলে জানান।
আমজাদের এই ব্যতিক্রমী বাগান দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও ক্রেতারা ভিড় করছেন। নাটোর পুলিশ লাইন্স স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া সোমা দিঘি বলেন, শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন আঙুর বাগান সত্যি অভাবনীয়। না দেখলে বিশ্বাসই হতো না যে আমাদের দেশের মাটিতে এত সুন্দর বিদেশি ফল উৎপাদন সম্ভব।
সৌদি আরবের একটি মসজিদের ইমাম, যিনি বাগানটি পরিদর্শনে এসেছিলেন, তিনি মন্তব্য করেন, সৌদিতে সাধারণত ছোট পরিসরে আঙুর চাষ দেখা যায়, কিন্তু নাটোরে এত বড় এবং সুন্দর সুমিষ্ট আঙুরের বাগান দেখে তিনি অভিভূত।
দূর নাটোর তো বটেই, রাজশাহী থেকেও ক্রেতারা আসছেন এখানে। রাজশাহী থেকে পরিবারসহ আসা আল আমিন নামের এক যুবক জানান, ফেসবুকে এই বাগানের ভিডিও দেখেই তিনি মূলত উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। নিজের বাড়িতে বাগান করার জন্য তিনি লাল রঙের ‘বাইকুনুর’ জাতের চারা কিনতে এসেছেন।
নাটোর কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক হাবীবুল ইসলাম খান জানান, আধুনিক ব্যবস্থাপনার কারণে নাটোরের মাটি ও আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য বেশ উপযোগী হয়ে উঠছে। তরুণ উদ্যোক্তা আমজাদ নিজস্ব উদ্যোগে এই চাষ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে আমরা রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তাকে দুটি পলিনেট হাউজ দিয়েছি। আমরা এখানকার আঙুরের মিষ্টতা পরীক্ষা করে দেখেছি, যা বাজারের আমদানিকৃত আঙুরের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক প্রশিক্ষণ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে দেশে আঙুর চাষের খাতটি আরও সম্প্রসারিত হবে। দৃঢ় মনোবল ও সঠিক প্রচেষ্টা থাকলে দেশের মাটিতেই বিদেশি ফলের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এর ফলে একদিকে যেমন ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে বিদেশেও দেশের আঙুর রফতানি করার এক বিরাট সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সময়ের আলো/জোই