সহযোগিতা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো পাঁচ খাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে তার প্রথম বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। এ সময় তার শি

2026-06-28T01:09:13+00:00
2026-06-28T01:09:13+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
সহযোগিতা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো পাঁচ খাতে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১:০৯ এএম 
মালয়েশিয়া-চীন সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংগৃহীত ছবি
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে তার প্রথম বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। এ সময় তার শি জিনপিংয়ে সঙ্গে একান্তে বৈঠক করার বিষয়টি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সফরের মাধ্যমে দীর্ঘ কূটনৈতিক শীতলতা ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার পর দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন গতিপথে প্রবেশ করেছে বলে দাবি করেছে সরকারি সূত্র ও সফরসংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা।

তাদের ভাষ্য- এই সফর দেশ দুটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ- এই পাঁচ খাতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সহযোগিতা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো আরও।

Advertisement
এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সফরটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন নয় বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি- চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ পেয়েছে।

মালয়েশিয়া সফর : 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাত্র ১৮ ঘণ্টার মালয়েশিয়া সফরকে কূটনৈতিকভাবে ‘ঝটিকা কিন্তু নিবিড়’ সফর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। এতে দুই দেশের মধ্যে শ্রমবাজার পুনরায় চালু, নতুন কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণসহ একাধিক বিষয় আলোচনা হয়।

মাহদী আমিন বলেন, মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক : 

সফর চলাকালে দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক ও নথি বিনিময় হয়েছে বলে জানানো হয়। পাশাপাশি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে একটি প্রাথমিক কাঠামো আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার শীর্ষ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে জ্বালানি, টেলিকম, অ্যাভিয়েশন, অটোমোবাইল ও বন্দর ব্যবস্থাপনা খাতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

কুয়ালালামপুরে শীর্ষ বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজ : 

সফরের দ্বিতীয় দিনে পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দালিয়ান হয়ে চীন সফরের সূচনা :

মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী চীনের দালিয়ানে যান, যেখানে তিনি একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের কর্মসূচিতে অংশ নেন। চীনে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

বেইজিং বৈঠক, কৌশলগত সহযোগিতার নতুন ধাপ : 

বেইজিংয়ে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক।

এতে আঞ্চলিক সংযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক করিডোর এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর প্রস্তাব সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই করিডোরের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

১৭টি সমঝোতা স্মারক, সহযোগিতার বিস্তৃত পরিসর : 

চীন সফরের সময় মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা জানানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন বেসরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা।

বন্দর উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সংযোগ : 

চীনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। মাহদী আমিন জানান, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও ট্রেড হাব হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জনসম্পর্ক : 

সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘পিপল টু পিপল’ সম্পর্ক উন্নয়ন। এতে শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষা, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিং এবং যৌথ শিক্ষা কর্মসূচি চালুর বিষয়ে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়।

স্বাস্থ্য ও ভিসা সহজীকরণ : 

চীনের সঙ্গে আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা এবং চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়টি উঠে আসে। বিশেষ করে রোবোটিক সার্জারি ও উন্নত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথা বলা হয়। বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়।

রোহিঙ্গা ইস্যু ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা : 

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপ সহজতর করতে চীনের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া ফরেন ও ডিফেন্স সংলাপ কাঠামো (টু-প্লাস-টু) চালুর বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতার কথাও জানানো হয়, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।

ব্রিকস ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি : 

বাংলাদেশের ব্রিকস সদস্যপদের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। চীন এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় আসে।


প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, চীন ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, দুই দেশের সঙ্গে আলোচনা বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

মাহদী জানান, প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফর তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়- মালয়েশিয়ায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং বেইজিংয়ে চীনের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনায় সার্বভৌমত্ব, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ‘পিপল টু পিপল’ সম্পর্ক জোরদারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাহদী আমিন জানান, চীনের রাষ্ট্রপতি শিজিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজার পুনরায় চালু হলে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

চীনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডোর প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। তবে এটি বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সহযোগিতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   সহযোগিতা  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  মালয়েশিয়া  চীন  সফর 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: